এমএনএ প্রতিবেদক
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকা ছেড়ে নিজ নিজ গ্রামের পথে ছুটছে মানুষ। ঈদের সময়ের মতোই, বরং তার চেয়েও বেশি যাত্রীর চাপ দেখা গেছে বাস ও লঞ্চ টার্মিনালগুলোতে। ভোটাধিকার প্রয়োগের তাগিদে দীর্ঘ ভোগান্তি ও কষ্ট উপেক্ষা করেই বাড়ি ফেরার এই স্রোত রাজধানীর পরিবহন কেন্দ্রগুলোতে এক আবেগঘন চিত্র তুলে ধরেছে।
সন্ধ্যায় সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে কথা হয় সোহেল আহমেদের সঙ্গে। পটুয়াখালীর বাসিন্দা সোহেল রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সবজি বিক্রি করেন। স্ত্রী ও মাকে সঙ্গে নিয়ে সকাল ৯টায় বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হলেও পাঁচ ঘণ্টা সায়দাবাদ ও যাত্রাবাড়ীতে দাঁড়িয়ে থেকেও বাসের টিকিট পাননি। অতিরিক্ত ভাড়া ও গাড়ি সংকটের কারণে শেষ পর্যন্ত লঞ্চে করে বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন তিনি।
সোহেল বলেন, “২০১১ সালে ভোটার হলেও জীবনে কখনও ভোট দিতে পারিনি। ২০১৪ সালে ভোট দিতে গিয়েও সুযোগ হয়নি। এবার মনে হচ্ছে নিজের ভোট নিজে দিতে পারবো। তাই শত কষ্ট হলেও বাড়ি যাচ্ছি। শান্তিতে ভোট দিতে পারলেই এই কষ্ট আর কষ্ট মনে হবে না।”
সোহেলের মতোই প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছেন লাইলি আক্তার। তিনি বরিশাল যাবেন। সদরঘাটে দাঁড়িয়ে লাইলি বলেন, “জীবনে প্রথম ভোট দেবো—এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। অফিস থেকে চার দিনের ছুটি পেয়েছি। যানজটের কথা ভেবে দুপুরেই বের হয়েছি। মিরপুর থেকে সদরঘাট আসতেই চার ঘণ্টা লেগেছে। কষ্ট হলেও ভোটটা নিজে দিতে পারলেই শান্তি।”
এদিকে মহাখালী বাস টার্মিনালেও সকাল থেকেই দেখা গেছে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। কেউ অফিস থেকে ছুটি নিয়ে, কেউ নাইট শিফট শেষ করে সরাসরি টার্মিনালে এসেছেন। গার্মেন্টসকর্মী, দোকানদার, শিক্ষক, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বয়স্ক নারী-পুরুষ—সবাই যেন এক উদ্দেশ্যে এক জায়গায় মিলিত হয়েছেন: ভোট দেওয়া।
ভোলার উদ্দেশ্যে পরিবার নিয়ে যাত্রা করা একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কর্মী রাজিব আহসান বলেন, “এবার নির্বাচন যেন ভোট উৎসবে পরিণত হয়েছে। গত তিনটি নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। সেই আবেগ থেকেই এবার মানুষ কষ্ট করেও বাড়ি যাচ্ছে। সবাই দেশের পরিবর্তন চায়, শান্তি চায়।”
সদরঘাটে যাত্রীচাপ বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি ব্যস্ততা দেখা গেছে ব্যবসায়ীদের মাঝেও। ফল বিক্রেতা জসিম উদ্দিন জানান, “ভোটকে সামনে রেখে কয়েকদিন ধরেই ঈদের মতো ভিড়। আমাদের বেচাকেনাও বেড়েছে।”
যাত্রী চাপ সামাল দিতে বিআইডব্লিউটিএ বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির যুগ্ম পরিচালক (নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা) মোবারক হোসেন। তিনি বলেন, “সাধারণ দিনের তুলনায় দ্বিগুণ লঞ্চ চালানো হচ্ছে। প্রতিটি রুটেই স্পেশাল লঞ্চ দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া ঠেকাতে ভাড়ার চার্ট টানানো হয়েছে এবং নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।”
পুরান ঢাকা থেকে সদরঘাটগামী সড়কগুলোতেও দুপুরের পর থেকে তীব্র যানজট দেখা যায়। সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীর চাপ আরও বাড়তে থাকে।
নির্বাচন মানেই শুধু ব্যালট বাক্স আর স্লোগান নয়—নির্বাচন মানেই ঘরে ফেরা। ভোটের এই যাত্রায় বাসস্ট্যান্ড ও লঞ্চঘাটগুলো হয়ে উঠেছে নাগরিক চেতনার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘ অপেক্ষা, ক্লান্ত মুখ আর নিরব দৃঢ়তায় ফুটে উঠছে গণতন্ত্রের এক নীরব সংগ্রাম।
এই ভিড় প্রমাণ করে—সব বাধা সত্ত্বেও মানুষের কাছে ভোট এখনও মূল্যবান। গণতন্ত্র কাগজে নয়, বেঁচে থাকে মানুষের পথচলায়, ঘরে ফেরার যাত্রায় এবং ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অপেক্ষায়।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
