আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, আর সেই সঙ্গে আবারও গভীর উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন সাধারণ ইরানিরা। গত ৮ এপ্রিল কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি আগামী ২২ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। যুদ্ধবিরতির শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে দেশজুড়ে বাড়ছে উৎকণ্ঠা।
এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় দেওয়া এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, “হরমুজ প্রণালির দিকে কোনো জাহাজ অগ্রসর হলে তা শত্রু শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা হিসেবে বিবেচিত হবে। যারা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করবে, তাদের জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালানো হবে।”
এর আগে শুক্রবার ইরান সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দিলেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দর ও জাহাজের ওপর আরোপিত অবরোধ বহাল রাখে। এরই প্রতিক্রিয়ায় শনিবার পুনরায় প্রণালিটি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় তেহরান।
ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন একাধিকবার আস্থার সংকট তৈরি করেছে এবং যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে ইরানের বাণিজ্যিক চলাচলের ওপর থেকে অবরোধ সরায়নি।
আইআরজিসি আরও বলেছে, “যুদ্ধবিরতির চুক্তি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও মার্কিন শত্রুরা ইরানি জাহাজ ও বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করেনি। ফলে আজ সন্ধ্যা থেকে অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।”
এছাড়া পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে অবস্থানরত বিদেশি জাহাজগুলোকে সতর্কবার্তা পাঠিয়ে বলা হয়েছে, তারা যেন বর্তমান নোঙর করা স্থান ত্যাগ না করে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট বাঘের ঘালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানকে “বিবেচনাহীন ও অজ্ঞতাপূর্ণ” বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, “ইরানের জাহাজ যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে না পারে, তাহলে অন্য কোনো দেশের জাহাজেরও এই পথ ব্যবহার করা সম্ভব হবে না।”
বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের এই অবস্থান শুধু কূটনৈতিক চাপ নয়, বরং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। কারণ বৈশ্বিক তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ এই হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
তেহরান থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক তৌহিদ আসাদি জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন ভয়, হতাশা এবং ক্ষোভ—সবই একসঙ্গে কাজ করছে।
তার ভাষায়, “অনেক ইরানি এখনও আশা করেন যে আলোচনার মাধ্যমে এই সংঘাতের সমাধান হতে পারে। কিন্তু সেই আশা খুবই সীমিত। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা তাদের বিশ্বাসকে দুর্বল করে দিয়েছে।”
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ একসময় মনে করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি চূড়ান্ত সমঝোতা হলে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে এবং তাদের জীবনমান উন্নত হবে। কিন্তু এখন সেই সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
তৌহিদ আসাদি আরও বলেন, “ইরানিরা শুধু যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কায় নয়, বরং যুদ্ধবিরতির মধ্যেও আতঙ্কে আছে। কারণ অতীতে আলোচনা চলাকালেই যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মুখে পড়েছে ইরান—একবার নয়, দুবার।”
তার মতে, পূর্বের আকস্মিক বিমান হামলাগুলোর স্মৃতি এখনও মানুষের মনে তাজা। ফলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধবিরতির শেষ মুহূর্তেও নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ দেখা যেতে পারে।
তবে ভয় এবং হতাশার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে প্রতিরোধের মনোভাবও স্পষ্ট। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বহু সাধারণ ইরানি প্রকাশ্যে সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছেন।
দিন-রাত বিভিন্ন স্থানে সরকারের পক্ষে অবস্থান জানিয়ে তারা বোঝাতে চাইছেন—বহিরাগত চাপের মুখে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় তারা ঐক্যবদ্ধ।
যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন আন্তর্জাতিক মহলও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েকদিনের সিদ্ধান্ত শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
