এমএনএ রিপোর্ট : সুনামগঞ্জে হাওরে বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং বন্যায় হাজার কোটি টাকার ফসলহানির ঘটনায় একটি মামলা করেছে জেলা আইনজীবী সমিতি। এর আগে এ ঘটনায় দুর্নীতির অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সুনামগঞ্জের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে হাওরের একমাত্র ফসল ডুবে জেলাব্যাপী দুর্যোগ নেমে আসায় এবং পরবর্তী সুনামগঞ্জবাসীকে নিয়ে কটাক্ষ করে বক্তব্য প্রদান করায় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শাহ কামালসহ ১৪০ জনকে আসামী করে আদালতে এই মামলাটি দায়ের করেছে সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি।
আজ বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ মুজিবুর রহমানের আদালতে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুল হক বাদী হয়ে এই মামলা করেন।
ক্রিমিনাল ল’এমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট ১৯৫৮’এর ৪ (২) বিধি অনুযায়ী দায়ের করা নালিশ মামলায় বাঁধের কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ৩৯ টি পিআইসি’র সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, পাউবো’র সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল হাইসহ ১৫ জন পাউবো কর্মকর্তা, ৪৬ জন ঠিকাদার এবং ৩৯ টি পিআইসি’র সভাপতি-সম্পাদককে মামলার আসামি করা হয়েছে।
মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৬৬ ধারার অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা, সেই সঙ্গে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের (৫) ২ ধারার অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পরিস্কারভাবে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে।
মামলায় উল্লেখ করা সদর থানায় একই বিষয়ে দুদকের একটি মামলা রুজু থাকায় থানা কর্তৃপক্ষ নতুন মামলা গ্রহণ না করায় আদালতের আশ্রয়ে তারা এই মামলা রুজু করছেন।
বাদী মামলাটি গ্রহণ করে দুর্নীতি দমন কমিশন মাধ্যমে তদন্তের আদেশ দিয়ে সু-বিচারের পথ উন্মুক্ত করার প্রার্থনা করেন আদালতে।
আদালতের বিচারক সুনামগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ মো. মুজিবুর রহমান মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য দুদকে প্রেরণের আদেশ দিয়েছেন। মামলায় সচিব ছাড়া অন্যদের বিরুদ্ধে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতি ও সরকারি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। সচিবের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে দন্ড-বিধির ৫০৫ (এ) ধারার অভিযোগ। এই ধারায় উল্লেখ আছে, ‘কথা ইত্যাদি কর্তৃক অনিষ্টকর কার্য।’
মামলার বাদী মো. আবদুল হক বলেন, আইনজীবী সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের স্বার্থে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
এর আগে গত ২ জুলাই হাওরে ফসলহানির ঘটনায় সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় পাউবোর ১৫ কর্মকর্তা ও ৪৬ জন ঠিকাদারকে আসামি করে দুর্নীতির অভিযোগে একটি মামলা করেন দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. ফারুক আহমদ। ওই মামলায় পাউবোর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আফছার উদ্দিন ও বাঁধের কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইব্রাহিম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. বাচ্চু মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা এখন কারাগারে আছেন।
বাদী মামলায় উল্লেখ করেন, ত্রাণ সচিব ফসলহানির ঘটনার সময় ১৯ এপ্রিল সুনামগঞ্জে আসেন। জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক সভায় তিনি বলেন, ‘দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নামে একটা আইন আছে। এই আইনের ২২ ধারায় বলা আছে, কোনো এলাকার অর্ধেকের ওপরে জনসংখ্যা মারা গেলে ওই এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হয়। না জেনে যারা এমন সস্তা দাবি জানায় তাদের কোনো প্রকার জ্ঞানই নেই।’ ত্রাণ সচিব অবজ্ঞার সুরে আরও বলেন, ‘কিসের দুর্গত এলাকা, একটি ছাগলও তো মারা যায়নি’-বাদী অভিযোগে এই মন্তব্যও উল্লেখ করেন।
বাদীর পক্ষে আদালতে মামলাটি দায়ের করেন আইনজীবী মো. শহীদুজ্জামান চৌধুরী। এ সময় আদালতে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সৈয়দ শায়েখ আহমদসহ সমিতির শতাধিক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।
সুনামগঞ্জে গত এপ্রিল মাসের পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ১৫৪টি হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে যায়। ২৭ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত সুনামগঞ্জে এই ফসলহানি ঘটে। এতে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৯৯০ জন কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হন। হাওরে ফসলহানির পর ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

