Don't Miss
Home / জাতীয় / হাজার কোটি টাকা খরচেও কাটেনি জলাবদ্ধতা, বর্ষার আগেই ডুবছে ঢাকা

হাজার কোটি টাকা খরচেও কাটেনি জলাবদ্ধতা, বর্ষার আগেই ডুবছে ঢাকা

বিশেষ প্রতিবেদক

গত ১৬ বছরে রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। একসময় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে খাল ও নালার ব্যবস্থাপনাও দুই সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু এত উদ্যোগ, প্রকল্প ও অর্থ ব্যয়ের পরও বর্ষা এলেই পুরোনো সংকট ফিরে আসে। চলতি বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই কয়েক দফা মাঝারি বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জলাবদ্ধতার সমস্যা এখন শুধু ড্রেন পরিষ্কার বা খাল খননের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি বহুস্তরীয় ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল। ফলে সাময়িক উদ্যোগে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও স্থায়ী সমাধান এখনও অধরাই রয়ে গেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতার পেছনে পাঁচটি প্রধান কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। প্রথমত, সড়কের ক্যাচপিটগুলো আবর্জনায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত ড্রেনে প্রবেশ করতে পারে না। দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ ড্রেন ও নর্দমা পলি ও কাদায় ভরাট হয়ে পানি প্রবাহের সক্ষমতা হারিয়েছে। তৃতীয়ত, রাজধানীর বহু গুরুত্বপূর্ণ খাল অবৈধ দখল, ভরাট ও সংকোচনের শিকার হয়েছে। চতুর্থত, বিদ্যমান পাম্পিং স্টেশন ও স্লুইসগেটের একটি বড় অংশ অকার্যকর বা সক্ষমতার তুলনায় দুর্বল। পঞ্চমত, ঢাকার চারপাশের নদ-নদীগুলোর নাব্যতা কমে যাওয়ায় সেগুলো অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে পারছে না।

ফলে বৃষ্টির পানি ক্যাচপিট থেকে ড্রেনে, ড্রেন থেকে খালে এবং খাল থেকে নদীতে যাওয়ার প্রতিটি ধাপেই বাধার মুখে পড়ছে। এর ফল হিসেবে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরজীবন স্থবির হয়ে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের পর রাজধানীর নিউমার্কেট, আজিমপুর, নীলক্ষেত, বকশিবাজার, মালিবাগ, শান্তিনগর, সায়েদাবাদ, শনির আখড়া, পুরান ঢাকা, বংশাল, ধানমন্ডি, মিরপুর, শেওড়াপাড়া, মতিঝিল, বনানী, খিলক্ষেত, উত্তরার কিছু অংশ, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, আগারগাঁও, ফার্মগেট, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, মেরুল বাড্ডা ও ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকায় নিয়মিত জলাবদ্ধতা দেখা গেছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) ইতোমধ্যে ২৯টি ঝুঁকিপূর্ণ ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করেছে। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে পশ্চিম মালিবাগ, খিলগাঁও, মানিকনগর, মুগদা, কমলাপুর, শাপলা চত্বর, পল্টন, ফকিরাপুল, ধানমন্ডি-২৭, গ্রিন রোড, নিউমার্কেট, ইস্কাটন, শান্তিবাগ, জুরাইন ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকা। তবে এসব স্পট চিহ্নিত হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এখনও দৃশ্যমান হয়নি বলে অভিযোগ নগরবাসীর।

সিটি কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ প্লাস্টিকজাত বর্জ্য।

এই প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য আবর্জনার বড় অংশ ড্রেন, নালা ও খালে গিয়ে জমা হচ্ছে। এতে পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রেন পরিষ্কারের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পরিবর্তন না আনলে জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রচেষ্টা সফল হবে না।

ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দক্ষিণ সিটির আয়তন ও জনঘনত্ব বিবেচনায় কমপক্ষে ১০টি পাম্পিং স্টেশন প্রয়োজন হলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র তিনটি।

এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিরঝিল পাম্পিং স্টেশনটি দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসসিসির এক জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী বলেন, “জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রথমেই পাম্পিং স্টেশনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ক্যাচপিট, ড্রেন, খাল এবং নদীগুলোর ধারণক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। কিন্তু সীমিত জনবল ও বাজেট নিয়ে দ্রুত স্থায়ী সমাধান করা কঠিন।”

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) জানিয়েছে, তাদের অধীনে পাঁচটি পাম্পিং স্টেশন রয়েছে এবং সেগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু উপেক্ষিত দিক হলো চারপাশের নদ-নদীর অবস্থা। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর বিভিন্ন অংশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে বর্ষাকালে স্লুইসগেট খুললেও অনেক ক্ষেত্রে পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা সম্ভব হয় না।

একাধিক প্রকৌশলী জানিয়েছেন, নদীগুলোর নাব্যতা পুনরুদ্ধার ছাড়া ঢাকার জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান বাস্তবসম্মত নয়।

নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান বলেন, “একটু বেশি বৃষ্টি হলেই দোকানের ভেতরে হাঁটু সমান পানি উঠে যায়। লাখ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হয়। বছরের পর বছর অভিযোগ করেও কোনো স্থায়ী সমাধান পাইনি। এবারও একই পরিস্থিতির আশঙ্কা করছি।”

মিরপুর কাজীপাড়ার বাসিন্দা মাসুম আহমেদ রনি বলেন, “বৃষ্টি হলেই আমাদের এলাকা ডুবে যায়। কোথায় কোথায় জলাবদ্ধতা হয়, সেটা সবাই জানে। তাহলে বছরের পর বছর একই সমস্যা কেন থেকে যাচ্ছে?”

ডিএসসিসি জানিয়েছে, স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ড্রেন, বক্স-কালভার্ট ও খাল পরিষ্কার, পোর্টেবল পাম্প ব্যবহার, বিদ্যমান পাম্প স্টেশন সক্রিয় রাখা এবং ওয়ার্ডভিত্তিক জরুরি প্রতিক্রিয়া দল গঠন করা হচ্ছে। এছাড়া ৫৭টি ওয়ার্ডের জন্য সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, “ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরবস্থা এবং ম্যানহোলে যত্রতত্র ময়লা ফেলার কারণেই পানি নিষ্কাশনে বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বর্ষার আগে সব ড্রেন ও নর্দমা পরিষ্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।”

অন্যদিকে ডিএনসিসি জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে ২২১ কিলোমিটারের বেশি স্টর্ম ওয়াটার ড্রেন ও ১.৫ কিলোমিটার বক্স কালভার্ট পরিষ্কার করেছে। পাশাপাশি ২৪ কিলোমিটার খাল খনন ও পরিষ্কার করা হয়েছে।

ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, “সম্ভাব্য জলাবদ্ধতা প্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে এয়ারপোর্ট রোড, মিরপুরসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ড্রেন ও খালের পানিপ্রবাহ সচল রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

নগর পরিকল্পনাবিদ ও ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, সমস্যার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করেও কার্যকর বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে সংকট স্থায়ী হয়েছে।

তিনি বলেন, “শুধু প্রকল্প নেওয়া বা অর্থ ব্যয় করলেই হবে না। সমস্যা অনুযায়ী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বিত বাস্তবায়ন ছাড়া ঢাকার জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা এখন আর কেবল প্রকৌশলগত সমস্যা নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, নদী রক্ষা এবং ভূমি দখল প্রতিরোধ—সব কিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জটিল নগর সংকট।

গত এক দশকের বেশি সময়ে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও খাল পুনরুদ্ধার, নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি, পাম্পিং সক্ষমতা উন্নয়ন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় টেকসই পরিবর্তন না আসায় সমস্যা একই জায়গায় রয়ে গেছে।

বর্ষা মৌসুম সামনে। সিটি কর্পোরেশনগুলোর প্রস্তুতির দাবি থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, রাজধানীবাসীকে হয়তো এবারও জলাবদ্ধতার পুরোনো দুর্ভোগ নিয়েই দিন কাটাতে হবে। স্থায়ী সমাধানের প্রতিশ্রুতি বহুবার এসেছে, কিন্তু নগরবাসী এখনও অপেক্ষা করছে দৃশ্যমান ফলাফলের জন্য।

x

Check Also

চাঁদাবাজির অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এমপি মান্নানের ছেলে সজীবকে ডিবি হেফাজতে

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান-এর ছেলে ও জেলা যুবদলের ...