Don't Miss
Home / আইন আদালত / নতুন কহেলা কলেজের পদত্যাগী অধ্যক্ষ ফারুকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, জালিয়াতি ও কাগজপত্র আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ

নতুন কহেলা কলেজের পদত্যাগী অধ্যক্ষ ফারুকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, জালিয়াতি ও কাগজপত্র আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে অবস্থিত নতুন কহেলা কলেজ-এর পদত্যাগকারী অধ্যক্ষ ইমাম হোসেন মোঃ ফারুকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, জালিয়াতি ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একাধিক তাগাদার পরও তিনি কলেজের মূল নথিপত্র ফেরত না দেওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে কলেজ সূত্রে জানা গেছে।

আদালতে মামলা, তদন্তে প্রমাণের ইঙ্গিত

কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মো. নাসির উদ্দিন বাবলু কলেজের নথিপত্র উদ্ধারের দাবিতে সম্প্রতি টাঙ্গাইল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা নং ৯০/২০২৬ দায়ের করেন। আদালত মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তদন্তের নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে এবং আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

এমপিও জালিয়াতি ও অবৈধ বেতন উত্তোলনের অভিযোগ

অভিযোগ অনুযায়ী, ইমাম হোসেন মোঃ ফারুক ২০০৩ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অনুমতিপ্রাপ্ত উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৪ সালের মে মাসে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কলেজ এমপিওভুক্ত হলে তিনি জাল নিয়োগপত্র তৈরি করে কারিগরি কলেজের (বিএমটি) অধ্যক্ষ হিসেবে নিজেকে দেখিয়ে এমপিওভুক্ত হন।

বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে ০৮ মার্চ ২০১০ তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন এবং ০১ এপ্রিল ২০১০ ঢাকার উত্তরা ক্রিডেন্স কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে সেখান থেকেও অনিয়মের অভিযোগে চাকরিচ্যুত হন। পরবর্তীতে কলেজ কর্তৃপক্ষকে ভুল তথ্য দিয়ে ভুয়া ছুটির কাগজ জমা দিয়ে আবারো নতুন কহেলা কলেজে চাকরিতে যোগ দেন।

২০১২ সালের ১০ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রুহী রহমান স্বাক্ষরিত এক পত্রে জানানো হয়, পদত্যাগের পর পুনরায় অধ্যক্ষ পদে এমপিওভুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। তবে অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি ১৯ নভেম্বর ২০১৬ পুনরায় কলেজে যোগদান করেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর ২২ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, তিনি জালিয়াতির মাধ্যমে কারিগরি শাখায় এমপিওভুক্ত হয়ে মে ২০০৪ থেকে মার্চ ২০১০ পর্যন্ত মোট ৫,০০,০২৫.৬৮ টাকা অবৈধভাবে উত্তোলন করেছেন। এ অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া ১৯ ডিসেম্বর ২০১৭ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত উত্তোলিত বেতনের বৈধতা নিয়েও তদন্ত চলছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালক ১৮ জানুয়ারি ২০২৫ কলেজ পরিদর্শন করে তদন্ত সম্পন্ন করেছেন।

রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ

অভিযোগে বলা হয়, তৎকালীন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ফজলুর রহমান খান ফারুককে ভুল তথ্য দিয়ে ভুয়া ছুটির কাগজ জমা দিয়ে আবারো ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগ দেন। এছাড়া সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন মন্টু ও সাবেক সংসদ সদস্য মোঃ একাব্বর হোসেনের সহযোগিতায় তিনি পুনরায় কলেজে যোগদানের সুযোগ পান বলে অভিযোগ রয়েছে। দ্বিতীয় দফায় চাকরিতে যোগ দিয়ে তিনি নানান অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ফলে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি আর কলেজে যাননি এবং যেতে পারেননি।

বর্তমানে কলেজের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দারের সহায়তায় তিনি কলেজে উপস্থিত না থেকেও সরকারি অংশের বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন। এ বিষয়ে একাধিকবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে কলেজ সূত্র দাবি করেছে।

অর্থ আত্মসাত ও সম্পদ বিক্রির অভিযোগ

কলেজ সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন সময়ে ৪০টি গাছ কেটে প্রায় ৬ লাখ টাকার কাঠ বিক্রি করা হয়, যা কলেজ তহবিলে জমা না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ। এছাড়া কলেজের গাছের কাঠ দিয়ে ব্যক্তিগত আসবাবপত্র তৈরি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, কলেজের জমি ক্রয়ের জন্য ৯ জন কর্মচারি নিয়োগের অনুদান হিসেবে সংগৃহিত প্রায় ৬০ লাখ টাকা এবং পুরাতন ভবন ও গাছ বিক্রির প্রায় ১৮ লাখ টাকা কলেজ ফান্ডে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

মূল কাগজপত্র ফেরত না দেওয়া ও রাতের অনুপ্রবেশ

অভিযোগ অনুযায়ী, কলেজের গুরুত্বপূর্ণ মূল নথিপত্র তিনি নিজের হেফাজতে রেখেছেন এবং তা এখনো ফেরত দেননি। এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির কাছেও তিনি স্বীকার করেছেন যে, কাগজপত্র তার কাছেই রয়েছে।

গত ০৯ জানুয়ারি ২০২৫ রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিনি মোটরসাইকেল নিয়ে কলেজে প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসী তাকে আটক করার চেষ্টা করলে তিনি কৌশলে স্থান ত্যাগ করেন। এ ঘটনায় মির্জাপুর থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে।

সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা

শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ২০২৫ ও ২০২৬ সালে একাধিকবার পত্র দিয়ে অবৈধভাবে উত্তোলিত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে এখনো তা পরিশোধ করা হয়নি বলে জানা গেছে।

তদন্তের অগ্রগতি

কলেজের নথিপত্র উদ্ধারে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, টাঙ্গাইল মির্জাপুর থানার অফিসার ইনচার্জকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসন তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেছে।

কলেজ সংশ্লিষ্টরা দ্রুত নথিপত্র উদ্ধার, অবৈধভাবে উত্তোলিত অর্থ ফেরত এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে, তাকে পাওয়া যায়নি।

x

Check Also

আড়াই বছরের মধ্যে ঢাকার চার আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল স্থানান্তর, আসছে রুটভিত্তিক কোম্পানি ব্যবস্থা

এমএনএ প্রতিবেদক রাজধানী ঢাকার যানজট কমানো, গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থাপনা গড়ে ...