এমএনএ প্রতিবেদক
রাজধানী ঢাকার যানজট কমানো, গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার লক্ষ্যে আগামী দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে রাজধানীর চারটি প্রধান আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, নৌপরিবহন এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। একই সঙ্গে ঢাকার বাস পরিচালনায় রুটভিত্তিক কোম্পানি ব্যবস্থা চালু, অবৈধ ও অস্থায়ী বাস কাউন্টার অপসারণ এবং টার্মিনালগুলোতে যাত্রীসেবার মানোন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সচিবালয়ে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপ’-এ এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী।
সরিয়ে নেওয়া হবে রাজধানীর চারটি প্রধান আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল—গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল স্থানান্তরিত হবে কাঁচপুরে, ফুলবাড়িয়া যাবে কেরানীগঞ্জে, গাবতলী সরবে হেমায়েতপুরে এবং মহাখালী বাস টার্মিনাল স্থানান্তরিত হবে উত্তরা-আব্দুল্লাহপুর সংলগ্ন এলাকায়।
মন্ত্রী জানান, ইতোমধ্যে মহাখালী বাস টার্মিনালের জন্য আব্দুল্লাহপুরের কাছে প্রায় ৫০ বিঘা জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এছাড়া ৩০০ ফিট এলাকায় একটি নতুন ডিপো এবং কাঁচপুরে আরেকটি বৃহৎ ডিপো নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে।
বর্তমান বাস টার্মিনালগুলোর কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে শেখ রবিউল আলম বলেন, অধিকাংশ টার্মিনাল এখন কার্যত বাসের ওয়ার্কশপ ও ডিপোতে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, “একটি বাস টার্মিনালে এসে আট-দশ দিন ধরে পড়ে থাকে। সেখানে রং করা হয়, ডেন্টিং করা হয়, ইঞ্জিন মেরামত করা হয়। যাত্রীসেবার জন্য তৈরি টার্মিনালকে এভাবে দীর্ঘমেয়াদি পার্কিং ও মেরামতকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা গ্রহণযোগ্য নয়।”
মন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতে টার্মিনালগুলো কেবল যাত্রী ওঠানামার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে। বাসগুলো নির্ধারিত সময়ের কিছু আগে টার্মিনালে এসে যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হবে। দীর্ঘ সময় ধরে বাস পার্কিং বা মেরামতের সুযোগ সেখানে থাকবে না।
সরকার তাৎক্ষণিকভাবে টার্মিনালগুলো সরিয়ে নিচ্ছে না উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, নতুন ডিপো ও অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর ধাপে ধাপে স্থানান্তর কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
“আমরা পর্যায়ক্রমে সর্বসাকুল্যে দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে চারটি টার্মিনাল স্থানান্তর করব। তবে এর আগে বিকল্প অবকাঠামো নিশ্চিত করা হবে, যাতে যাত্রী ও পরিবহন মালিকদের কোনো ভোগান্তি না হয়,” বলেন তিনি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা বেসরকারি বাস কোম্পানির কাউন্টারগুলোও পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান মন্ত্রী। বিশেষ করে কলাবাগান, কল্যাণপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার পাশে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলার প্রবণতা বন্ধ করা হবে।
তিনি বলেন, “কাউন্টারের সামনে বাস এনে যাত্রী তোলার সুযোগ আর থাকবে না। এসব কাউন্টারকে কেন্দ্র করে যেসব অস্থায়ী টার্মিনাল তৈরি হয়েছে, সেগুলোও ধীরে ধীরে অপসারণ করা হবে।”
ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় সংস্কার হিসেবে রুটভিত্তিক কোম্পানি গঠনের পরিকল্পনার কথা জানান সড়ক পরিবহন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, বর্তমানে একই রুটে একাধিক ব্যক্তি মালিকানাধীন বাস চলার কারণে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, বেপরোয়া চালনা এবং যাত্রীসেবায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে প্রতিটি রুটে সংশ্লিষ্ট বাস মালিকদের নিয়ে একটি করে কোম্পানি গঠন করা হবে।
“একই রুটে বিচ্ছিন্নভাবে দুই, চার বা দশজন মালিকের বাস চলবে না। নির্দিষ্ট রঙ, নির্দিষ্ট মান, নির্ধারিত ফিটনেস এবং অভিন্ন সেবার মান বজায় রেখে কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনা করতে হবে,” বলেন তিনি।
মন্ত্রী জানান, সরকার পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাস বা ই-ভেহিকল ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে এবং এ বিষয়ে পরিবহন মালিকদের সঙ্গে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে।
শেখ রবিউল আলম স্বীকার করেন যে বর্তমানে রাজধানীর প্রধান বাস টার্মিনালগুলোতে যাত্রীবান্ধব পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক যাত্রী টার্মিনালে যেতে আগ্রহী হন না এবং শহরের বিভিন্ন কাউন্টার থেকেই বাসে উঠতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
তিনি বলেন, “সায়েদাবাদ, গাবতলী বা মহাখালী—কোনোটিই এখনও আধুনিক বাস টার্মিনালের মানে পৌঁছাতে পারেনি। বিশেষ করে এসি ও প্রিমিয়াম বাসের যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সেখানে নেই।”
এই সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনগুলোকে টার্মিনাল উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
পরিকল্পনার আওতায় টার্মিনালগুলোতে আধুনিক টয়লেট, পর্যাপ্ত ফ্যান ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, বড় অপেক্ষাকক্ষ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং অন্যান্য যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা হবে।
অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) টার্মিনাল এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এর অংশ হিসেবে সিসিটিভি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত স্ট্রিটলাইট এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।
মন্ত্রী জানান, বাস মালিক সমিতিও উন্নত পরিবেশ পেলে টার্মিনাল এলাকায় নিজস্ব বিনিয়োগে অবকাঠামো গড়ে তুলতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
গণপরিবহন খাতে চলমান সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে শেখ রবিউল আলম বলেন, আগামী চার থেকে ছয় মাসের মধ্যেই রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাবে।
তিনি বলেন, “সবকিছু পুরোপুরি বাস্তবায়ন হতে সময় লাগবে। তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই যাত্রীরা টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ এবং সেবার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাবেন।”
বিএসআরএফ সভাপতি মাসউদুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক উবায়দুল্লাহ বাদল।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
