Don't Miss
Home / আজকের সংবাদ / সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে বিজেপি: তৃণমূল-শিবসেনায় ভাঙনের পর নজর কি সমাজবাদী পার্টি-ডিএমকের দিকে

সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে বিজেপি: তৃণমূল-শিবসেনায় ভাঙনের পর নজর কি সমাজবাদী পার্টি-ডিএমকের দিকে

 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে বিজেপির সাংগঠনিক ও সংসদীয় কৌশল। বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর আগেই ক্ষমতাসীন দলটি লোকসভা ও রাজ্যসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে সক্রিয় হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা চলছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেস এবং উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনায় সাম্প্রতিক ভাঙন এই বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনারই অংশ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার যত দ্রুত সম্ভব সংসদের আসনসংখ্যা বৃদ্ধি, সংশোধিত নারী সংরক্ষণ বিল এবং ‘এক দেশ, এক ভোট’ নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধনের পথ তৈরি করতে চায়। আর সেই লক্ষ্য পূরণে সংসদের উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।

কেন প্রয়োজন দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা?

ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করতে লোকসভা ও রাজ্যসভা উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে সংসদের কাঠামোগত পরিবর্তন কিংবা নির্বাচন ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হলে সরকারকে এই সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করতে হবে।

বিজেপির রাজনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ— সংসদের আসনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নারী সংরক্ষণ কার্যকর করা; ও ‘এক দেশ, এক ভোট’ ব্যবস্থার মাধ্যমে কেন্দ্র ও রাজ্যের নির্বাচন একই সময়ে আয়োজন।

ক্ষমতাসীন শিবিরের হিসাব অনুযায়ী, এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেও রাজনৈতিক সুবিধা ধরে রাখা সহজ হবে।

তৃণমূলে ভাঙন: বিজেপির নতুন কৌশল?

লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের মোট ২৯টি আসন রয়েছে, যদিও একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত রয়েছে। সম্প্রতি দলটির ২০ জন সাংসদ দলত্যাগ করে তুলনামূলকভাবে অখ্যাত রাজনৈতিক দল ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-তে যোগ দিয়েছেন।

রাজনৈতিক মহলে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হচ্ছে যে, বিজেপির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থনেই এই নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠেছে। বিদ্রোহী সাংসদরা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে নিজেদেরকে “প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস” দাবি করে নতুন রাজনৈতিক অবস্থানের স্বীকৃতি চেয়েছেন। একই সঙ্গে তারা বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের সঙ্গে “গঠনমূলক সহযোগিতা” করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

তবে তৃণমূল কংগ্রেস এই পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ বেআইনি বলে দাবি করেছে। দলের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেছেন, সাংসদদের এই দলত্যাগ দলবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং দলত্যাগবিরোধী আইনের পরিপন্থী। তিনি সংশ্লিষ্ট সাংসদদের সদস্যপদ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।

স্পিকার এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। তবে রাজনৈতিক মহলের ধারণা, বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই এই ভাঙনকে বৈধতা দেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিষয়টি আদালতে গড়ানোর সম্ভাবনাও প্রবল।

শিবসেনায় আবারও ভাঙন

মহারাষ্ট্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনার ৯ জন লোকসভা সদস্যের মধ্যে ৬ জন দলত্যাগ করে একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবসেনায় যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

শিন্ডেপন্থী শিবসেনা বর্তমানে বিজেপির ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় এই ঘটনাকেও বিজেপির বৃহত্তর সংসদীয় কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরের রাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল হয়েছে।

পরবর্তী লক্ষ্য কি সমাজবাদী পার্টি?

রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে উত্তর প্রদেশের সমাজবাদী পার্টি (এসপি) নিয়ে। অখিলেশ যাদবের নেতৃত্বাধীন এই দলের লোকসভায় ৩৭ জন সদস্য রয়েছেন।

দুই-তৃতীয়াংশ ভাঙন ঘটাতে হলে বিজেপিকে অন্তত ২৬ জন সাংসদকে নিজেদের পক্ষে আনতে হবে। যদিও এটি অত্যন্ত কঠিন লক্ষ্য, তবুও বিজেপির রাজনৈতিক দক্ষতা এবং সাম্প্রতিক সাফল্যের কারণে এমন সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।

বিজেপির এক শীর্ষ নেতার ভাষায়, “নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই।”

‘ওয়াশিং মেশিন’ বিতর্ক

বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা যেমন ইডি এবং সিবিআইকে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো বিরোধী নেতা বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যত স্থবির হয়ে গেছে। এই কারণেই বিরোধীরা বিজেপিকে ব্যঙ্গ করে “ওয়াশিং মেশিন” বলে আখ্যা দিয়েছে।

তাদের দাবি, দলত্যাগীদের অনেকেই তদন্তের ভয় কিংবা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষার আশায় বিজেপির ঘনিষ্ঠ হচ্ছেন।

সংখ্যার অঙ্ক কী বলছে?

বর্তমানে লোকসভার কার্যকর সদস্যসংখ্যা ৫৪০। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৩৬০ সদস্যের সমর্থন। এই মুহূর্তে এনডিএর আসনসংখ্যা ২৯৩। তৃণমূলের ২০ এবং উদ্ধবপন্থী শিবসেনার ৬ সদস্যকে যুক্ত করলে সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১৯। অর্থাৎ এখনও ৪১ জন সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। যদি সমাজবাদী পার্টির ২৬ সদস্যও এনডিএর পক্ষে চলে আসেন, তাহলেও সংখ্যাটি দাঁড়াবে ৩৪৫। তখনও প্রয়োজন হবে আরও ১৫ জন সাংসদের সমর্থন। এই বাস্তবতা বিজেপিকে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ খুঁজতে বাধ্য করছে।

ডিএমকে: বিজেপির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য?

বিজেপির কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন রয়েছে তামিলনাড়ুর ডিএমকে। লোকসভায় দলটির ২২ জন সদস্য রয়েছে। যদিও দলটি ঐতিহাসিকভাবে বিজেপির অন্যতম প্রধান বিরোধী শক্তি, তবুও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে নতুন সমীকরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে ডিএমকের ভরাডুবি এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান রাজ্যের রাজনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছে। সরকার গঠনের প্রশ্নে কংগ্রেস, বামপন্থী দল এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে ডিএমকের সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে চায় বিজেপি।

স্ট্যালিন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ডিএমকে নেতা এম কে স্ট্যালিন দীর্ঘদিন ধরেই সংসদের আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশনের বিরোধিতা করে আসছেন। তাঁর আশঙ্কা, জনগণনার ভিত্তিতে আসনসংখ্যা বৃদ্ধি করা হলে উত্তর ও মধ্য ভারতের জনবহুল রাজ্যগুলো ব্যাপক সুবিধা পাবে, আর দক্ষিণ ভারতের তুলনামূলক কম জনসংখ্যা বৃদ্ধির রাজ্যগুলো রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়বে।

স্ট্যালিনের মতে, এতে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে দক্ষিণ ভারতের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

গত বছর দক্ষিণের রাজ্যগুলোর স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে তিনি লোকসভার আসন বৃদ্ধি অন্তত আরও ৩০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। তাই বিজেপির সাংবিধানিক সংস্কার পরিকল্পনা সফল হবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করছে স্ট্যালিন তাঁর বর্তমান অবস্থান পরিবর্তন করেন কি না তার ওপর।

রাজ্যসভায় বিজেপির অবস্থান আরও শক্তিশালী

লোকসভার তুলনায় রাজ্যসভায় বিজেপির লক্ষ্য অর্জন অপেক্ষাকৃত সহজ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

২৪৫ সদস্যের রাজ্যসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৬৪ সদস্যের সমর্থন। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও উপনির্বাচনের পর এনডিএর শক্তি বেড়ে ১৫২-এ পৌঁছেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের তিন সদস্যের পদত্যাগের ফলে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে বিজেপির আসন আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য তাদের প্রয়োজন হবে মাত্র ৯ জন অতিরিক্ত সদস্যের সমর্থন।

ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিজেপির বর্তমান কৌশল কেবল কয়েকটি দল ভাঙানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর লক্ষ্য অনেক বড়—সংসদের কাঠামো পরিবর্তন, নির্বাচনী এলাকা পুনর্বিন্যাস এবং ‘এক দেশ, এক ভোট’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক প্রভাব সুসংহত করা।

জম্মু-কাশ্মীর ও আসামে ডিলিমিটেশনের পর যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, বিজেপি সেই অভিজ্ঞতাকে জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োগ করতে চায় বলেই বিরোধীদের অভিযোগ।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দুটি—  সমাজবাদী পার্টিতে কি বিজেপি বড় ধরনের ভাঙন ধরাতে পারবে? এবং ডিএমকে প্রধান এম কে স্ট্যালিন কি দক্ষিণ ভারতের দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে সরে এসে বিজেপির সাংবিধানিক সংস্কার পরিকল্পনাকে সমর্থন করবেন? এই দুই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে ভারতের সংসদীয় রাজনীতির আগামী অধ্যায়।

x

Check Also

বিদেশে আটকে থাকা বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ ফেরত চায় ইরান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তহবিল মুক্তি বড় ইস্যু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সম্পদ ফেরত পাওয়ার চেষ্টা ...