নিজস্ব প্রতিবেদক
উজানে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ, সিকিম ও উত্তরবঙ্গ অঞ্চলে ভারি বৃষ্টিপাত এবং দেশের অভ্যন্তরে চলমান মৌসুমি বর্ষণের প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্রসহ বিভিন্ন নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় রংপুর বিভাগের একাধিক জেলায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একইসঙ্গে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের কয়েকটি জেলাতেও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
রোববার (২১ জুন) সকাল থেকে তিস্তা অববাহিকায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের মানুষ উদ্বেগে রয়েছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার মাত্র ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।
পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর এলাকায় দ্বিতীয় তিস্তা সেতু রক্ষা বাঁধের একটি অংশ ধসে পড়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে যে বাঁশের পাইলিং স্থাপন করেছিল, তা ভেঙে যাওয়ায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুর উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে প্রায় ৯০০ মিটার দীর্ঘ সেতু রক্ষা বাঁধের ১৫০ মিটারের বেশি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়ক এবং গুরুত্বপূর্ণ সেতুটি হুমকির মুখে পড়েছে। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মানুষ যাতায়াত করেন।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করে অস্থায়ীভাবে বাঁশের পাইলিং বসানোর কারণে সরকারি অর্থ অপচয় হয়েছে এবং এখন সেতুর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়েছে।
তিস্তার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীতীরবর্তী চরাঞ্চল ও নিম্নভূমিতে পানি প্রবেশ শুরু করেছে। রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক স্থানে আমন মৌসুমের বীজতলা ও বিভিন্ন ফসলের খেত পানিতে তলিয়ে গেছে।
মহিপুর চরের কৃষক মকবুল হোসেন বলেন, উজানের পানির চাপ দেখে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা করছেন তারা। অন্যদিকে চর ইচলি এলাকার কৃষক আমজাদ আলীর দেড় বিঘা বাদামের ক্ষেত ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে।
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের সেতু রক্ষা বাঁধে নতুন করে ভাঙন দেখা দেওয়ায় তিনটি গ্রামের অন্তত এক হাজার পরিবার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও পাটগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে তিস্তার পানি ঢুকতে শুরু করেছে। কালীগঞ্জ উপজেলার চর শৌলমারী এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, পুরো চরাঞ্চল ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি আরও বাড়লে অনেক পরিবারকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হতে পারে।
কুড়িগ্রামেও ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বাড়ছে। চরাঞ্চলের কৃষকরা আবাদি জমি ও গবাদিপশু নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি শুরু করেছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিন দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার নদীগুলোর পানি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলেও নতুন করে পানি বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে জামালপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও সিরাজগঞ্জ জেলার নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বায়ুচাপের তারতম্য এবং উজানের বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে পাহাড়ি ঢল ও নদীর পানির উচ্চতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের গেট খুলে দেওয়ায় তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যারাজের সব জলকপাট খোলা রাখা হয়েছে এবং নদীতীরবর্তী জনগণকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রংপুর বিভাগীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব বলেন, তিস্তা অববাহিকায় বন্যার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। নদীর পানি ও ভাঙন পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে জরুরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত এবং ত্রাণ সামগ্রী মজুদের কাজ শুরু করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
