বিশেষ প্রতিনিধি, কুয়ালালামপুর
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং আঞ্চলিক সংযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে একমত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী দাতো’ সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সরকারি বিদেশ সফর। বৈঠক শেষে কুয়ালালামপুরে যৌথ সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি মালয়েশিয়াকে বাংলাদেশের “বিশ্বস্ত ও দীর্ঘদিনের অংশীদার” হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বন্ধুত্ব পারস্পরিক আস্থা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং জনগণের মধ্যে দৃঢ় সম্পর্কের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি স্মরণ করেন, ১৯৭৯ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং ১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মালয়েশিয়া সফর দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
মালয়েশিয়ার সরকার ও জনগণের আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, দুই নেতার আলোচনায় দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। উভয় পক্ষ বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় কাঠামো—বিশেষ করে যৌথ কমিশন বৈঠক এবং দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নিয়মিত পরামর্শ প্রক্রিয়া—আরও সক্রিয় করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক সম্পর্ককে স্বাগত জানিয়ে দুই দেশ প্রস্তাবিত বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাজার সম্প্রসারণে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের নির্বাচনে জনগণের শক্তিশালী সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।
তিনি বলেন, “আমরা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলছি এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছি।” এ সময় তিনি মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল শ্রমবাজার ও জনশক্তি সহযোগিতা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার কাছে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের অনুরোধ জানান এবং বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত পুনরায় চালুর আহ্বান জানান।
তিনি অনিয়মিত বা অবৈধ অবস্থানে থাকা বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধতা প্রদান এবং আটক বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও উত্থাপন করেন।
দুই নেতা একমত হন যে ভবিষ্যতে শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায্য, সাশ্রয়ী এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অযাচিত প্রভাবমুক্ত। এর মাধ্যমে অভিবাসন ব্যয় কমবে এবং শ্রমিকরা আরও বেশি সুবিধা পাবেন।
বর্তমানে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী দেশটির অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মানবিক সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানান। তিনি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পক্ষে মালয়েশিয়ার ধারাবাহিক সমর্থনের প্রশংসা করেন।
আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রসঙ্গে তারেক রহমান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা আরও জোরদারের আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বাংলাদেশকে আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক জোটগুলোর একটি আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (আরসিইপি)-এ যোগদানের আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় সমর্থন দেওয়ার জন্য মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
দুই নেতা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক ফোরামে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতায় মালয়েশিয়ার সমর্থনেরও প্রশংসা করেন।
সফরকালে স্বাক্ষরিত ও বিনিময় হওয়া বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব উদ্যোগ বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্কের ইতিবাচক গতি আরও শক্তিশালী করবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সফর দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে এবং যৌথ সমৃদ্ধি, আঞ্চলিক শান্তি ও আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গঠনে সহায়ক হবে।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও তাঁর সহধর্মিণীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি মালয়েশিয়ার সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “আমরা এই সফরের অনেক মধুর স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে দেশে ফিরছি।”
বিশ্লেষকদের মতে, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে, বিশেষ করে শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
