নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক হয়রানি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং শ্রমিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
সংগঠনটির প্রকাশিত জুন-২০২৬ মাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৯ জন নিহত ও ৩৪৬ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন এবং আহত হয়েছেন আরও ৬৯ জন। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু এবং নির্যাতন ও হয়রানির মুখে পড়েছেন ৪৭ জন সাংবাদিক।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য প্রকাশ করে এইচআরএসএস। প্রতিবেদনে দেশের ১৬টি জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, সংগঠনটির নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ এবং ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জুন মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন মাসে সারাদেশে ৫৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জন আহত হয়েছেন। মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ছিল ৫ এবং আহত হন ২৮৯ জন। সে তুলনায় জুনে হতাহত উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
রাজনৈতিক সংঘর্ষের মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ২১টি ঘটনায় ৩ জন নিহত ও অন্তত ১৪৬ জন আহত হন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ৮টি সংঘর্ষে ২ জন নিহত ও ৩৬ জন আহত হন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে ১৪টি সংঘর্ষে ২ জন নিহত এবং ১১৫ জন আহত হন। এছাড়া বিএনপি-এনসিপির মধ্যে ৫টি ঘটনায় ১৮ জন, বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫টি ঘটনায় ৯ জন আহত হন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘটিত আরও ৫টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ২২ জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির ৪ জন, আওয়ামী লীগের ২ জন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের ১ জন, ইউপিডিএফের ১ জন এবং একটি চরমপন্থী সংগঠনের ১ সদস্য।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, দলীয় কোন্দল, চাঁদাবাজি এবং প্রতিপক্ষের ওপর হামলাকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া দুষ্কৃতকারীদের হামলায় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর অন্তত ১২টি ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ২২ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৩ জন, বিএনপির ৫ জন এবং একটি চরমপন্থী সংগঠনের ১ সদস্য রয়েছেন। একই সময়ে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার ও দখলদারিত্বকে কেন্দ্র করে অন্তত ১৫টি ঘটনায় প্রায় ৪৫টি বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২২টির বেশি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় ৬২৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ১ হাজার ২৬২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
এছাড়া রাজনৈতিক ও অন্যান্য ঘটনায় মোট ২৫৭টি অভিযানে অন্তত ৪ হাজার ৭৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ১ হাজার ৫৫৯ জন নেতা-কর্মী, বিএনপির ৩৫ জন এবং জামায়াতে ইসলামীর ২ জন রয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাকবিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার এবং ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে জুন মাসে ৬৩টি মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত ৩১ জন নিহত এবং ৬৯ জন আহত হয়েছেন।
এছাড়া ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, আসামি ছিনতাই এবং স্থানীয় জনগণের হামলাসহ ২৯টি ঘটনায় ৬৬ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আহত বা হামলার শিকার হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন মাসে ৩৯টি ঘটনায় মোট ৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৮ জন আহত, ৫ জন লাঞ্ছিত এবং ৯ জন হুমকির মুখে পড়েন। এছাড়া ৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে এবং ৭টি মামলায় ১২ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।
একই সময়ে সভা-সমাবেশ আয়োজনের ক্ষেত্রে ৬টি ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বাধার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ১৭ জন আহত এবং ৩৬ জনকে আটক করা হয়েছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে অন্তত ১১টি ঘটনায় ১১ জনকে আটক করা হয়েছে এবং ৭টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সমালোচনার অভিযোগে ৬ জন এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর অধীনে পৃথক ৪টি মামলায় ৯ জনকে অভিযুক্ত এবং ৪ জনকে আটক করা হয়েছে।
এইচআরএসএস জানায়, জুন মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হেফাজত ও নির্যাতনের ঘটনায় অন্তত ৩ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২ জন কথিত বন্দুকযুদ্ধে এবং ১ জন ডিবি হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান।
এছাড়া গ্রেপ্তার এড়াতে পালানোর সময় ধাওয়া খেয়ে আরও ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
একই মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে ৪ জন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি এবং ৩ জন হাজতি ছিলেন। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১ জন, বিএনপির ১ জন এবং সাধারণ বন্দি ছিলেন ৫ জন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ১২টি হামলায় ৭ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ১২টি মন্দির, ১১টি প্রতিমা এবং ৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এক নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৫টি ঘটনায় ২ জন নিহত, ২ জন আহত এবং ৪ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। বিএসএফ ১ জনকে আটক করেছে। এছাড়া ৭ জনকে পুশইন করা হয়েছে এবং ৪ শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশুকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুঁতে রাখা স্থলমাইনের বিস্ফোরণে পৃথক ৩টি ঘটনায় এক রোহিঙ্গা যুবকসহ ৩ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ৩টি ঘটনায় ১২ জনকে আটক করেছে আরাকান আর্মি।
জুন মাসে ৫৫টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ১১ জন নিহত এবং ১৮৪ জন আহত হয়েছেন। অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় কর্মস্থলে আরও ৩৯ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন।
বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলনের সময় ২৬ জন গার্মেন্টস শ্রমিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া দুইজন গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু এবং একজন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এইচআরএসএস জানায়, জুন মাসে মোট ৩৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
এর মধ্যে ১০৬ জন নারী, শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭৫ জন, অর্থাৎ প্রায় ৭১ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। এছাড়া ১৯ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের পর ২ জন কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে।
একই সময়ে ৯৪ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪৯ জনই শিশু।
যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতায় ৪ জন নারী নিহত, ৪ জন আহত এবং ২ জন আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক সহিংসতায় ৫৭ জন নারী নিহত, ৪৮ জন আহত এবং ৩৬ জন আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া এসিড নিক্ষেপে আহত হয়েছেন একজন নারী।
অন্যদিকে, জুন মাসে ২৯১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৩৭ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
প্রতিবেদনের বিষয়ে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, জুন মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি একটি সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল পর্যায়ের মধ্য দিয়ে গেছে। রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় সংসদকে ঘিরে বিতর্ক এবং জননিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা এবং শ্রমিক নির্যাতনের ধারাবাহিকতা উদ্বেগজনক। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপের প্রবণতা নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
তিনি মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকারের আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মানবাধিকার রক্ষায় নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন এবং সাধারণ জনগণকে আরও সক্রিয় ও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
