মহসীনুল করিম
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু এমন এক নাম, যাঁকে ঘিরে ইতিহাস, আবেগ, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং রহস্য—সবকিছুই পাশাপাশি চলে। ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইহোকুতে বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল কি না, তাঁর অন্তর্ধানের প্রকৃত রহস্য কী—এই প্রশ্নগুলি নিয়ে গত আট দশকে অসংখ্য বই, গবেষণা, কমিশন, সরকারি নথি এবং জনশ্রুতি তৈরি হয়েছে।
কিন্তু নেতাজীকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে আড়ালে থেকেছে—আজাদ হিন্দ সরকার ও ভারতীয় জাতীয় সেনার জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবাসী ভারতীয়দের কাছ থেকে সংগৃহীত বিপুল অর্থ, সোনা, গয়না ও অন্যান্য মূল্যবান সম্পদের কী হয়েছিল?
প্রবীণ সাংবাদিক ও গবেষক ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায়ের ‘নেতাজীর সম্পদ রহস্য’ বইটি সেই প্রশ্নকেই অনুসন্ধানের কেন্দ্রে এনেছে। বইটি গত ১৬ অগাস্ট প্রকাশিত হয়েছে। বইটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—লেখক নিছক কিংবদন্তি বা প্রচলিত রাজনৈতিক বয়ানের ওপর নির্ভর না করে সরকারি নথি, তদন্ত-রিপোর্ট, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বিভিন্ন সাক্ষ্যের মধ্য দিয়ে হারিয়ে যাওয়া সম্পদের ইতিহাস পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন।
‘INA Treasure’—কিংবদন্তি নয়, সরকারি নথিভুক্ত বিষয়
‘নেতাজীর সম্পদ’ নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এটি কেবল লোকমুখে প্রচলিত কোনও গল্প নয়। ভারত সরকারের নথিতেই “INA Treasure” নামে পৃথক নথি ও প্রশাসনিক যোগাযোগের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
২০১৫-১৬ সালে নেতাজি-সংক্রান্ত বহু গোপন নথি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। প্রকাশিত নথির মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দফতর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিও ছিল। এসব নথিতে আজাদ হিন্দ সরকারের সম্পদ, নেতাজীর শেষ যাত্রায় বহন করা মূল্যবান সামগ্রী এবং পরবর্তীকালে সেগুলোর সরকারি হেফাজতে আসার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে।
এই জায়গাতেই বইটির অনুসন্ধানের ভিত্তি শক্তিশালী হয়। কারণ গবেষণার প্রশ্নটি আর শুধু—‘নেতাজীর সম্পদ কোথায় গেল?’—এমন নয়; বরং প্রশ্ন দাঁড়ায়, কোন সম্পদ কোথায় ছিল, কে তার দায়িত্বে ছিল, কখন তা হস্তান্তরিত হয়েছে এবং সরকারি নথিতে তার পরবর্তী গতিপথ কী?
আজাদ হিন্দের অর্থভাণ্ডার কতটা বড় ছিল?
১৯৫৬ সালের শাহনওয়াজ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারতীয়দের কাছ থেকে আজাদ হিন্দ আন্দোলনের জন্য ব্যাপক অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী সংগ্রহ করা হয়েছিল। নেতাজী ও তাঁর সহযোগীরা এই অর্থ সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ‘নেতাজী ফান্ড কমিটি’ও গঠিত হয়েছিল।
শুধু নগদ অর্থ নয়—সোনা, অলংকার এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীও ভারতীয়রা আন্দোলনের জন্য দান করেছিলেন। কমিটির সামনে দেওয়া সাক্ষ্যে সম্পদের পরিমাণ সম্পর্কে বিভিন্ন দাবি উঠে আসে। কেউ প্রায় এক কোটি রুপির সম্পদের কথা বলেছেন, কেউ বলেছেন ১৭টি বাক্সে সম্পদ বহন করা হয়েছিল; আবার অন্য সাক্ষ্যে বাক্সের সংখ্যা, ওজন ও প্যাকেজিং নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।
এই অসঙ্গতিগুলিই বইটির আলোচনাকে আরও আকর্ষণীয় করে। কারণ এখানে ‘একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক’কে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পরিবর্তে প্রশ্ন ওঠে—আসল সম্পদের পরিমাণ কত ছিল? এবং যুদ্ধ, পশ্চাদপসরণ ও বিমান দুর্ঘটনার পর তার কতটা অবশিষ্ট ছিল?
১৯৪৫: শেষ যাত্রায় সম্পদ
শাহনওয়াজ কমিটির নথিতে নেতাজীর শেষ যাত্রায় সম্পদ বহনের বিষয়ে একাধিক সাক্ষ্যের উল্লেখ রয়েছে।
নেতাজীর ব্যক্তিগত সহকারী কুন্দন সিংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, মূল্যবান সামগ্রী কয়েকটি স্টিলের বাক্সে রাখা ছিল। সেখানে নারীদের ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের গয়না, ঘড়ির চেন, হার, বালা, ব্রেসলেট, কানের দুল, পাউন্ড, গিনি এবং সোনার তার ছিল। অন্য সাক্ষ্যে বাক্সের সংখ্যা ও সম্পদের পরিমাণ ভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই পার্থক্য ইতিহাসবিদের সামনে একটি মৌলিক সমস্যা তৈরি করে—কোন সাক্ষ্য কতটা নির্ভরযোগ্য?
শাহনওয়াজ কমিটিও এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেনি। বরং কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতাজীর সঙ্গে থাকা সম্পদের পরিমাণ সম্পর্কে শুরু থেকেই অসঙ্গতি ছিল এবং দুর্ঘটনার পরে উদ্ধার হওয়া সম্পদের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়।
তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনা এবং উদ্ধার হওয়া গয়না
বিমান দুর্ঘটনার পর পুড়ে যাওয়া ও ক্ষতিগ্রস্ত কিছু অলংকার উদ্ধার করা হয়েছিল বলে সাক্ষ্যে উঠে আসে। এগুলো একটি ধাতব ক্যান বা পাত্রে রাখা হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে জাপানে ভারতীয় মিশনের কাছে পৌঁছায়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—পরবর্তী সময়ে ভারতীয় কূটনৈতিক মিশন সত্যিই এই সম্পদের একটি অংশ গ্রহণ করেছিল।
১৯৫১ সালে টোকিওর ভারতীয় লিয়াজোঁ মিশনের প্রধানের সঙ্গে কয়েকজন ভারতীয় যোগাযোগ করেন। তাঁরা জানান, বিমান দুর্ঘটনার স্থান থেকে সংগৃহীত কিছু সোনা ও গয়না তাঁদের কাছে রয়েছে। সঙ্গে কিছু জাপানি মুদ্রাও ছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এসব সম্পদ ভারতীয় মিশনের হেফাজতে রাখা হয়। জাপানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির পর ১৯৫২ সালের নভেম্বরে তা একটি বাক্সে করে দিল্লিতে পাঠানো হয়।
এটি বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিলভিত্তিক ভিত্তি।
কারণ এখানে ধারাবাহিকতা স্পষ্ট: টোকিও → ভারতীয় মিশন → সরকারি নির্দেশ → সম্পদ গ্রহণ → দিল্লিতে প্রেরণ → সরকারি হেফাজত।
জাতীয় জাদুঘরে পৌঁছাল সম্পদ
সরকারি নথিতে আরও বলা হয়েছে, ১৯৫৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর সোনা ও গয়না নিরাপদ হেফাজতের জন্য ন্যাশনাল মিউজিয়ামে হস্তান্তর করা হয়। নগদ অর্থ পরে INA Relief Fund-এ স্থানান্তরিত হয়েছিল।
অর্থাৎ ‘নেতাজীর সম্পদ সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে গিয়েছিল’—এমন সরল সিদ্ধান্ত সরকারি নথি সমর্থন করে না। বরং নথি দেখায়, সম্পদের অন্তত একটি অংশ ভারতীয় রাষ্ট্রের হাতে পৌঁছেছিল এবং তা সরকারি প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত হয়েছিল। কিন্তু এখানেই আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হয়—এটি কি সম্পূর্ণ INA Treasure ছিল, নাকি বিপুল সম্পদের একটি ক্ষুদ্র অংশ?
১৯৫৬ সালের শাহনওয়াজ কমিটি: রহস্য আরও ঘনীভূত
নেতাজীর অন্তর্ধান অনুসন্ধানের জন্য ১৯৫৬ সালে শাহনওয়াজ খান কমিটি গঠিত হয়। কমিটির প্রতিবেদনে আলাদা একটি অধ্যায় ছিল ‘Treasure’ নিয়ে। এই অধ্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কমিটি শুধু বিমান দুর্ঘটনা ও নেতাজীর মৃত্যুর প্রশ্নই বিবেচনা করেনি; নেতাজীর শেষ যাত্রায় থাকা সম্পদ এবং দুর্ঘটনার পর তার কী হয়েছিল, সেটিও পরীক্ষা করেছিল। কমিটি জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত সম্পদও পরিদর্শন করেছিল। সেখানে পাওয়া গয়নার আনুমানিক মূল্য তখন প্রায় এক লাখ রুপি বলে উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ: কমিটির হাতে এমন কোনও নিশ্চিত প্রমাণ ছিল না, যার ভিত্তিতে বলা যায় যে জাদুঘরে থাকা সম্পদই নেতাজীর সঙ্গে থাকা সম্পূর্ণ সম্পদ। বরং কর্নেল হাবিবুর রহমানের বক্তব্যসহ বিভিন্ন সাক্ষ্যে উদ্ধার হওয়া বাক্সের ওজন, অবস্থা এবং পরবর্তী হস্তান্তর নিয়ে অসঙ্গতি পাওয়া যায়। এক পর্যায়ে এমন প্রশ্নও ওঠে—বাক্সটি কি আগের অবস্থায় ছিল, নাকি তার মধ্যে থেকে কিছু কমে গিয়েছিল? কমিটি শেষ পর্যন্ত সম্পদের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা: কমিটির সতর্কতা
শাহনওয়াজ কমিটির প্রতিবেদনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই। কমিটি সরাসরি কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সম্পদ আত্মসাতের জন্য দায়ী করেনি। বরং তারা বলেছিল, প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে সম্পদের বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় এবং প্রয়োজনে পৃথক তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে। এমনকি আজাদ হিন্দ সরকারের সমগ্র সম্পদ ও দায়দায়িত্ব—নগদ ও অন্যান্য সম্পদসহ—পরীক্ষা করার জন্য পৃথক তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে বলেও কমিটি মত দিয়েছিল।
এই সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরবর্তী সময়ে ‘INA Treasure’ নিয়ে যে সমস্ত চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তৈরি হয়েছে, তার সবকটিকে সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে উপস্থাপন করা ইতিহাসসম্মত হবে না।
নেহরু সরকারকে ঘিরে বিতর্ক
‘নেতাজীর সম্পদ রহস্য’ আলোচনার আরেকটি বিতর্কিত অধ্যায় জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকারের ভূমিকা। প্রকাশিত নথি ও পরবর্তী সাংবাদিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, টোকিও থেকে সম্পদ নিয়ে ভারতীয় সরকারের কাছে বিভিন্ন যোগাযোগ হয়েছিল। কিছু নথি নিয়ে পরবর্তীকালে অভিযোগ ওঠে যে সম্পদের একটি বড় অংশের হিসাব স্পষ্ট ছিল না। তবে এখানে ইতিহাস ও রাজনৈতিক অভিযোগের মধ্যে সীমারেখা রাখা জরুরি।
কিছু লেখক ও গবেষক ‘INA Treasure’কে স্বাধীন ভারতের প্রথম দিককার বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে তুলনা করেছেন। কিন্তু এই ধরনের অভিযোগকে প্রমাণিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করার আগে নথি, সাক্ষ্য এবং প্রত্যক্ষ প্রমাণ পৃথকভাবে বিচার করা প্রয়োজন। সমসাময়িক ও পরবর্তী সূত্রে এমন অভিযোগের পাশাপাশি তার বিরোধিতাও রয়েছে।
এই জায়গায় বইটির গুরুত্ব—যদি এর দলিলসমূহ যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়ে থাকে—প্রচারিত কাহিনির বদলে প্রশ্নগুলিকে নথির আলোকে বিচার করার সুযোগ তৈরি করা।
১৯৭৮: আবার সামনে এল ‘INA Treasure’
বিষয়টি স্বাধীনতার কয়েক দশক পরেও সরকারি আলোচনায় ছিল। ১৯৭৮ সালের একটি সরকারি নথিতে ১৯৫১ সালে টোকিওতে সম্পদ হস্তান্তর, ১৯৫২ সালে দিল্লিতে পাঠানো এবং ১৯৫৩ সালে জাতীয় জাদুঘরে জমা দেওয়ার বিবরণ পুনরায় উল্লেখ করা হয়। আরও উল্লেখযোগ্য, ১৯৭৮ সালের সরকারি নথিতে শাহনওয়াজ কমিটি জাতীয় জাদুঘরে রাখা বাক্সটি পরিদর্শন করেছিল বলেও উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ ‘INA Treasure’ কোনও এককালীন রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল না; বিষয়টি স্বাধীন ভারতের প্রশাসনিক ও সংসদীয় নথিতেও ফিরে ফিরে এসেছে।
১৯৭৮ সালের পরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
পরবর্তীকালে জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত প্যাকেট খোলার ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়। একটি প্রতিবেদনে ১৯৭৮ সালের অক্টোবর মাসে সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সিল করা প্যাকেট খুলে পোড়া ও ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের গয়না, কানের দুল, নাকের অলংকার, সোনার তার ও হার পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
এই দৃশ্য কেবল একটি সম্পদের তালিকা নয়; এটি ইতিহাসের একটি প্রতীকী দলিল—যেখানে যুদ্ধ, বিমান দুর্ঘটনা, স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণের ইতিহাস একই সঙ্গে মিশে আছে।
তাহলে রহস্যের সমাধান কোথায়?
এই বইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই—এটি পাঠককে একটি চূড়ান্ত, নাটকীয় উত্তর দেওয়ার বদলে আরও কয়েকটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
প্রথম প্রশ্ন: নেতাজীর শেষ যাত্রায় মোট কত সম্পদ ছিল?
দ্বিতীয় প্রশ্ন: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আজাদ হিন্দ সরকার ও INA-র মোট সম্পদ কত ছিল?
তৃতীয় প্রশ্ন: বিমান দুর্ঘটনার পর কত সম্পদ উদ্ধার করা হয়েছিল?
চতুর্থ প্রশ্ন: উদ্ধার হওয়া সম্পদের কতটা জাপানে সংরক্ষিত ছিল?
পঞ্চম প্রশ্ন: ভারতীয় মিশনের হাতে ঠিক কতটা সম্পদ পৌঁছেছিল?
ষষ্ঠ প্রশ্ন: জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত সম্পদ কি সেই সম্পদের সম্পূর্ণ অংশ, নাকি কেবল একটি অংশ?
সপ্তম প্রশ্ন: যদি এটি কেবল একটি অংশ হয়ে থাকে, অবশিষ্ট সম্পদের কী হয়েছিল?
এই প্রশ্নগুলির সবগুলোর উত্তর এখনও সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
জনশ্রুতি বনাম দলিল
নেতাজীকে ঘিরে ইতিহাসচর্চার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—তাঁকে নিয়ে অসংখ্য কিংবদন্তি তৈরি হয়েছে। তাঁর অন্তর্ধান, বিমান দুর্ঘটনা, গোপন জীবন, সোভিয়েত রাশিয়ায় অবস্থান কিংবা সম্পদ—প্রতিটি বিষয়েই জনশ্রুতি এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সংখ্যা কম নয়। এই জায়গায় ‘নেতাজীর সম্পদ রহস্য’-এর গুরুত্ব হল, বিষয়টিকে একটি নির্দিষ্ট নথিভিত্তিক প্রশ্নে পরিণত করা।
শাহনওয়াজ কমিটির প্রতিবেদনের ভাষ্যও সতর্ক। তারা সম্পদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সাক্ষ্য গ্রহণ করেছে, উদ্ধার হওয়া সামগ্রী পরীক্ষা করেছে; কিন্তু চূড়ান্তভাবে সম্পদের কী হয়েছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি।
ফলে একজন গবেষণামুখী পাঠকের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হবে—যা প্রমাণিত, তাকে প্রমাণিত হিসেবে; যা সন্দেহ, তাকে সন্দেহ হিসেবে; আর যা অভিযোগ, তাকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা।
বইটির গবেষণামূল্য
নেতাজীকে নিয়ে অসংখ্য আবেগনির্ভর বইয়ের মধ্যে দলিলনির্ভর অনুসন্ধানের প্রয়োজন সবসময়ই ছিল। ‘নেতাজীর সম্পদ রহস্য’ সেই প্রয়োজনের জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে তিনটি কারণে বইটির গুরুত্ব রয়েছে। প্রথমত, সরকারি নথির ব্যবহার। INA Treasure-সংক্রান্ত সরকারি ফাইল, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং তদন্ত-প্রতিবেদনকে আলোচনায় আনা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, হারানো সম্পদের প্রশ্নকে আলাদা ঐতিহাসিক বিষয় হিসেবে দেখা। নেতাজীর মৃত্যু বা অন্তর্ধানের প্রশ্নের বাইরে আজাদ হিন্দের আর্থিক সম্পদের ইতিহাসও যে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের অংশ, বইটি সেই বিষয়টি সামনে আনে। তৃতীয়ত, প্রশ্ন তোলার সাহস। ইতিহাসের একটি অধ্যায়কে ‘রহস্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা মানেই ষড়যন্ত্রের গল্প তৈরি করা নয়। বরং যেখানে সরকারি নথিও অসম্পূর্ণ, পরস্পরবিরোধী বা প্রশ্ন রেখে যায়, সেখানে নতুন গবেষণার প্রয়োজন আছে—বইটি সেই জায়গাটিই তুলে ধরে।
লেখক ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায়: সাংবাদিকতা থেকে ইতিহাস অনুসন্ধান
প্রদত্ত লেখক-পরিচয় অনুযায়ী, ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায়ের প্রকৃত নাম আনন্দময় মুখোপাধ্যায়। ১৯৪৬ সালে জন্ম নেওয়া এই লেখক-সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবন সাংবাদিকতা, ইতিহাসচর্চা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত।
তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু বিশুদ্ধ বিজ্ঞান নিয়ে হলেও পরবর্তীতে তিনি আইন অধ্যয়ন করেন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে যান। দেশে ফিরে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে The Times of India এবং পরে The Indian Express গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর যুক্ত থাকার কথা লেখক-পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিকতার পেশাগত অভিজ্ঞতা তাঁর গবেষণার পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেই প্রতীয়মান হয়। কারণ একজন সাংবাদিকের প্রধান শক্তি হলো—প্রশ্ন করা, উৎস যাচাই করা, নথি খোঁজা এবং বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্যে অসঙ্গতি শনাক্ত করা।
এই অভিজ্ঞতাই তাঁর ইতিহাসভিত্তিক লেখালেখির ভিত গড়ে দিয়েছে বলে বইটির পরিচিতি থেকে ধারণা পাওয়া যায়।
ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে তাঁর আগ্রহ
লেখক-পরিচিতি অনুযায়ী তাঁর গবেষণার পরিসর বিস্তৃত। আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস, গণতন্ত্রের বিকাশ, বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবর্তন, বঙ্গীয় দুর্ভিক্ষ, সমকালীন ভারতীয় রাজনীতি এবং বিশেষভাবে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর লেখার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নেতাজীকে কেন্দ্র করে তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘কোথায় নেতাজি’, যেখানে নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্য আলোচনার বিষয়; আর নতুন গ্রন্থ ‘নেতাজীর সম্পদ রহস্য’ সেই গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—আজাদ হিন্দের সম্পদ ও তার পরবর্তী ইতিহাস—সামনে নিয়ে আসে।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ
প্রদত্ত লেখক-পরিচিতি অনুযায়ী ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায়ের প্রকাশিত গ্রন্থের তালিকায় রয়েছে— India in Search of Democracy; The Great Bengal Famine; নতুন ভারতের খোঁজে — স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের ইতিহাস; মৃত্যুঞ্জয়ী ফিদেল কাস্ত্রো; সিঙ্গুর থেকে রাইটার্স; দ্য গ্রেট বেঙ্গল ফেমিন — বাংলা সংস্করণ; দ্য ডিপ স্টেট : বাংলার সর্বনাশ; কোথায় নেতাজি; নেতাজীর সম্পদ রহস্য; ও বাংলা কবিতার সংকলনসহ আরও কয়েকটি গ্রন্থ।
লেখকের আরও কিছু গবেষণামূলক কাজ ভবিষ্যতে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে বলেও তাঁর পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ইতিহাসচর্চায় অংশগ্রহণ
লেখক-পরিচিতিতে আরও বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত International History Congress-এ তিনি ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন। এ ধরনের আন্তর্জাতিক ইতিহাস সম্মেলনে অংশগ্রহণ তাঁর গবেষণার পরিসরকে শুধু ভারতীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস, স্বাধীনতা আন্দোলন এবং রাষ্ট্রগঠনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের সঙ্গেও তাঁর কাজকে যুক্ত করেছে বলে পরিচিতিতে দাবি করা হয়েছে।
সম্মাননা ও সম্পাদনা
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ইতিহাস গবেষণা ও সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তিনি একাধিক সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৬ সালে Media Council of India-এর Best Historian and Journalist Award এবং ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে Mahasweta Devi Memorial Award-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে তিনি কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা ওয়েব দৈনিক ‘সংবাদ প্রবাহ’-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও লেখক-পরিচিতিতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে এই পুরস্কার, পদবি ও জীবনীসংক্রান্ত তথ্যগুলোর সবকটির স্বাধীন প্রাথমিক উৎস এই অনুসন্ধানে নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে প্রকাশনার আগে এগুলোর ক্ষেত্রে পুরস্কারদাতা প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম বা লেখকের নিজস্ব জীবনী/প্রকাশকের তথ্য দিয়ে তথ্য যাচাই করা বাঞ্ছনীয়।
শেষ কথা: সম্পদের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ইতিহাসের দায়
‘নেতাজীর সম্পদ রহস্য’ শেষ পর্যন্ত শুধু সোনা, গয়না বা হারানো অর্থের গল্প নয়। এর গভীরে রয়েছে একটি বড় প্রশ্ন—স্বাধীনতার জন্য জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত সম্পদের প্রতি রাষ্ট্র ও ইতিহাসের দায় কতটা?
আজাদ হিন্দ সরকার ছিল ভারতের স্বাধীনতার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক উদ্যোগ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারতীয়রা যে অর্থ, সোনা ও গয়না সেই আন্দোলনে দিয়েছিলেন, তা নিছক ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে দেখা যায় না। তাই সেই সম্পদের হিসাব, সংরক্ষণ, স্থানান্তর এবং পরবর্তী ব্যবস্থাপনা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সরকারি নথি অন্তত এতটুকু নিশ্চিত করে যে ‘INA Treasure’ বাস্তব প্রশাসনিক বিষয় ছিল; একটি অংশ জাপান থেকে ভারতীয় সরকারি হেফাজতে এসে জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত হয়েছিল। কিন্তু একই সঙ্গে সরকারি তদন্তের নথিই দেখায়—সম্পদের সামগ্রিক পরিমাণ, উদ্ধার হওয়া অংশ এবং পরবর্তী গতিপথ সম্পর্কে প্রশ্ন রয়ে গিয়েছিল। এই দ্বৈত সত্যই বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
নেতাজীর সম্পদ কোথায় গেল—এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর হয়তো এখনও নেই। কিন্তু প্রশ্নটি যে ইতিহাসের অংশ, তার প্রমাণ রাষ্ট্রীয় নথিতেই রয়েছে। আর সেখানেই ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায়ের ‘নেতাজীর সম্পদ রহস্য’-এর প্রাসঙ্গিকতা—এটি পাঠককে কোনও তৈরি করা কিংবদন্তি বিশ্বাস করতে বাধ্য করে না; বরং দলিলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করতে শেখায়। ইতিহাসের ক্ষেত্রে হয়তো এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
কারণ ইতিহাসের সব রহস্যের উত্তর একদিনে পাওয়া যায় না; কিন্তু সঠিক প্রশ্নটি নথির সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়াই অনেক সময় সত্য অনুসন্ধানের প্রথম ধাপ।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
