নগরজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে গ্যাস। কোথাও কখনো পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হলে রীতিমতো হাহাকার শুরু হয়ে যায়। গ্যাসের দাবিতে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। কিন্তু সেই গ্যাস যে ক্রমেই কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠছে, তা অনেকেই লক্ষ করছি না। জীবন বাঁচাতে এজন্য গ্যাস ব্যবহারে সতর্কতা এবং গণ সচেতনতা জরুরি হয়ে পড়েছে।
গত শুক্রবার উত্তরার একটি বহুতল ভবনের সাত তলার একটি ফ্ল্যাটে ঘটেছে তেমনই এক হূদয়বিদারক ঘটনা। চুলার সংযোগ বা পাইপের লিক থেকে সারা রাত গ্যাস ছড়াতে থাকে দরজা-জানালা বন্ধ থাকা ফ্ল্যাটটিতে। খুব ভোরে চুলা ধরানোর জন্য দিয়াশলাই কাঠি জ্বালাতেই বিস্ফোরণ ঘটে সব ঘরে একসঙ্গে আগুন ধরে যায়। তিন সন্তানসহ স্বামী-স্ত্রী অগ্নিদগ্ধ হন। দুই সন্তান ইতিমধ্যেই মারা গেছে। দম্পতির অবস্থাও আশঙ্কাজনক। এমন ঘটনা উত্তরায় এই একটিই নয়। হাসপাতাল ও পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৪ মাসে একইভাবে গ্যাসের আগুনে পুড়ে মারা গেছে নারী-শিশুসহ ২৪ জন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী গত এক বছরে শতাধিক গ্যাস দুর্ঘটনায় আক্রান্তরা চিকিৎসা নিতে এখানে এসেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, রাজধানীতে গত দুই বছরে গ্যাস দুর্ঘটনার সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। কারো কারো মতে, এই ধারা যদি এখনই রোধ করা না যায়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে তা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
এটি অনস্বীকার্য যে গ্যাসের চুলায় রান্না নাগরিক জীবনে অনেক স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে। কিন্তু এই অতি দাহ্য বায়বীয় পদার্থটি ব্যবহারে যে ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন তার অভাব রয়েছে। দুর্বল সংযোগ, ছোটখাটো ত্রুটিকে অবহেলা করা কিংবা দীর্ঘক্ষণ ধরে অযথা চুলা জ্বালিয়ে রাখা তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে অননুমোদিত সংযোগ নেওয়া। ফলে দুর্ঘটনার সংখ্যাও ক্রমে বেড়ে চলেছে। গ্যাস ব্যবহারের এর চেয়ে বড় বিপদ নিয়েও বিজ্ঞানীরা হরহামেশাই আমাদের সাবধান করছেন। তাঁদের মতে, ঢাকায় যদি মোটামুটি শক্তিশালী কোনো ভূমিকম্প হয়, তাহলে এখানকার বেশির ভাগ বাড়িঘরই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভবনধসে যদি কিছু মানুষ বেঁচেও যায়, আগুনের হাত থেকে তারা বাঁচতে পারবে না। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা গ্যাস পাইপলাইন থেকে অনবরত গ্যাস বেরোতে থাকবে আর তা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাজুড়ে সৃষ্টি করবে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। ভূমিকম্পে বেঁচে যাওয়া মানুষ মারা যাবে আগুনে পুড়ে। তাই পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবনা-চিন্তা করার সময় এসেছে বলেই মনে করেন তাঁরা। সে ক্ষেত্রে তাঁরা নিরাপদ সিলিন্ডার সরবরাহ কিংবা অন্যান্য বিকল্প সহজলভ্য করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
প্রকাশিত খবরে জানা যায়, উত্তরায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটি বেশ কিছুদিন ধরেই গ্যাসের পাইপে লিক থাকার বিষয়টি বাড়িওয়ালাকে জানিয়ে আসছিল। কিন্তু বাড়িওয়ালা প্রয়োজনীয় সংস্কার করাননি। অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে এমন ভয়ানক অবহেলার জন্য বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি নিরাপদ গ্যাস সংযোগের বিষয়ে সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষ কী ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে, তাও ভেবে দেখতে হবে।
-সম্পাদক
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
