এমএনএ ফিচার ডেস্কঃ বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হবে সন্দেহ নেই। কিছু দিন ধরে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট চলছে। এজন্য সরকার প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতিকে দায়ী করেছে। বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবেলায় নিয়ম করে লোডশেডিং চলছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার মার্চ মাসে দেশের জনসংখ্যার শতভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা বলা হয়েছে। আমাদের পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানী সংকটের কারণে তা সম্ভব নয়। তাই পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত নীতিগত সমন্বয়ের প্রয়োজন।
সরকার ইতিমধ্যে ডিজেল চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় প্রতি সপ্তাহে একদিনের জন্য জ্বালানি স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে ঢাকাসহ সারাদেশে পরিকল্পিতভাবে দিনে ১ থেকে ২ ঘন্টা লোডশেডিং করা হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং আরো বেশি।
বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের(বিপিডিবি)এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫.৪৯% বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় গ্যাস থেকে, ১৮.৯০% আসে ফার্নেস অয়েল থেকে, ১৪.৯৮% কয়লা থেকে। ০.৫৬% জলজ উৎস থেকে। ১০.৩৭ অন্যান্য উৎস থেকে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুত ব্যবহারের কৃচ্ছতা সাধনের মধ্য দিয়ে আগামীতে যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সহজ হবে।
প্রাকৃতিক গ্যাস বর্তমানে আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ৫২ শতাংশ মিটাতে পারছে। আগামী দুই দশকের বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদনে হাইড্রোকার্বন শিল্পের আধিপত্য থাকবে বলে মনে হয়।তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমাদের ঘাটতি রয়েছে।দুটি এলএনজি টার্মিনাল এবং একটি গ্যাস পাইপলাইনও ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট নয়। এলএনজির দাম আরও বাড়তে পারে বলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা ধারনা করছেন।কারণ ইউরোপের দেশগুলো শীতের সময় তাদের চাহিদা পূর্ণ করতে আরও বেশি এলএনজি কিনবে।
বাংলাদেশ হাইড্রোকার্বন বহনকারী পলির কাঠামো এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তম তেল ও গ্যাসের মজুদ নিয়ে সমৃদ্ধ। তুলনামূলকভাবে ক্লিনার এলএনজি ভবিষ্যতের জন্য আরেকটি বিকল্প হতে পারে। তবে আরো টেকসই ও বিকল্প শক্তির উৎস খুঁজে বের করতে হবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের প্রয়োজন। আমাদের এখন গ্যাসের মজুদ খুঁজে বের করাই হবে প্রথম কাজ। সম্ভাব্য অফসোর এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানে মনোনিবেশ করতে হবে। প্রতিবেশী ভারত ও মায়ানমার তাদের অফসোর হাইড্রোকার্বন ব্লকে গ্যাসের বিশাল ভান্ডার অনুসন্ধানে নেমেছে। বাংলাদেশকে এরকম দুএকটি গ্যাস ক্ষেত্র খুঁজে বের করতে হবে।আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলি ২৬টি অফশোর ব্লক, ১৫টি গভীর সমুদ্রের ব্লক এবং ১১টি অগভীর জলের ব্লকে অনুসন্ধানে বাংলাদেশের প্রস্তাবে রাজি হয়নি।এর কারণ তেলের দাম পড়ে যাওয়া।
জরিপ নিয়ে আলোচনা হলেও এর অগ্রগতি নেই। বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ অত্যধিক বেশী। বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে নেতিবাচক দিক রয়েছে তাও বিবেচ্য বিষয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলো গ্রিনহাউস সমস্যার সৃষ্টি করে। পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতিও করে থাকে। তাই খরচের বিবেচনায় ভবিষ্যতের জন্য কয়লা প্রযুক্তির দিকে বাংলাদেশের কাজ করা উচিত।
ঝুঁকির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশসহ সর্বত্র পারমাণবিক শক্তি একটি বিতর্কিত বিষয়। যাইহোক, পারমাণবিক শক্তি এই মুহূর্তে সবচেয়ে শক্তিশালী উৎসগুলির মধ্যে একটি। আমাদের রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অত্যন্ত ঝুঁকি হলেও এ মুহুর্তে এই প্রকল্প অতন্ত কার্য্কর ও সবচেয়ে শক্তিশালী উৎসের মধ্যে একটি। আমাদের রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে এবঙ দক্ষিণাঞ্চলেও নতুন পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দের কথা ভাবা হচ্ছে।
এছাড়া বাংলাদেশ সরকার বায়ু, হাইড্রো, বায়োশক্তি এবং সৌরশক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কর্মসূচির পরিকল্পনার কথাও ভাবছে। কিন্তু বিশাল শিল্প প্রয়োজনীয়তার কথা ভাবা হলে এসব পরিকল্পনা অবাস্তব।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। কৃষির উৎপাদিত ফসলের অবশিষ্টাংশ, পৌরসভার কঠিন বর্জ্য ব্যবহার করে বায়োশক্তি উৎপাদন করতে পারে। ভূ-তাপীয় শক্তি ব্যবহার করে ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রও স্থাপন করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সবসময়ই একটি চ্যালেঞ্জিং ও উন্নয়নের জন্য অন্তরায়। তবে বিগত এক দশক ধরে বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি ও এর আওতা বাড়াতে মনোনিবেশ করেছে এবং সফলও হয়েছে। আগামীতে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে আরো বিদ্যুৎ উৎপাদনে মনোনিবেশ করতে হবে। ক্রমবর্ধমান জনশক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে দেশে শিল্পায়ন হবে। ফলে বিদ্যুতের চাহিদাও দিন দিন বেড়ে যাবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হলে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানের কোন বিকল্প নেই। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশের অভ্যন্তরে নতুন প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎস খোঁজার দিকে আরো চেষ্টা চালাতে হবে। উপরন্তু, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। কেননা আমাদের বিপুল পরিমাণ কয়লার মজুদ আছে। পাশাপাশি আমাদের সৌরশক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবেলা করা সম্ভব।
সরকার বর্তমানে বিদ্যুতের রেশনিং ব্যবস্থা সাময়িক সংকট মোকাবেলা করা যাবে। বিকেল ৫টার পর শপিংমল ও বাজার বন্ধ রাখা, এনার্জি সেভিং বাল্ব ব্যবহারে ব্যাপক প্রচার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এয়ার কন্ডিশনের ব্যবহার কমাতে জনগনকে অবহিত করতে হবে।তবে দীর্ঘ মেয়াদী সংকট মোকাবেলায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের কোন বিকল্প নাই।
গ্রামীন জনপদে বিদ্যুতায়ন নিশ্চিত করতে সরকার প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছে। কিন্তু সেখানে বিদ্যুতের ব্যাপক অপচয় হয়। বর্তমানে এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের প্রয়োজনীয় ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। শহর ও শিল্পায়ন এলাকায় বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে।
শ্রীলঙ্কায় বর্তমানে জ্বালানি সংকট রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে দেশের চাহিদা মেটাতে তারা জ্বালানী আমদানী করতে পারছেনা। রিজার্ভে কম বৈদেশিক মুদ্রার কারণে শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতি হতে পারে এমন ১২টি দেশ চিহ্নিত করা হয়েছে। রিজার্ভে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার থাকায় বাংলাদেশ শক্তিশালী অবস্থানে আছে। বিশ্বপরিস্থিতির কারণে আমাদের রিজার্ভে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা মারাত্মকভাবে কমে গেলে দক্ষিণ এশিয়ায় আমরাও বৈশ্বিক রাজনীতির শিকারে পরিণত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আমরা যদি গ্যাস ক্রয় করি, তাতে বৈদেশিক রিজার্ভে টান পড়বে। এজন্য রিজার্ভ ঠিক রাখতে বিদ্যুতে অপচয় ও ব্যবহারে সাশ্রয়ী হবার কোন বিকল্প নাই। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আমাদের সম্পদ বাড়াতে হবে। আমরা যদি আমাদের সম্পদ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারি, তাহলে গভীর সংকটে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই গভীর সংকট মোকাবেলায় দেশের সকল মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট এই সংকট নিয়ে কোন রাজনীতি কাম্য নয়। দলবল নির্বিশেষে সবাইকে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে হবে। বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুৎসহ আরো যে সব পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, সেসব সংকট মোকাবেলা করা দেশের মানুষ হিসেবে সকলকে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে হবে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য বিরোধীদল যদি সরকারকে দোষারোপ করে তাতে সংকট আরো জটিল হবে। সেই সংকট দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলে কারো পক্ষে তা মোকাবেলা করা সম্ভব হবেনা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে গত এক দশকে অনেক বড় বড় চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছে। দেশের ষোল কোটি মানুষ দেশাত্মবোধ নিয়ে বিরাজমান সংকট মোকাবেলায় এগিয়ে আসলে বর্তমান সমস্যা সমাধানের পথ প্রশস্থ হবে।দেশের কল্যাণের জন্য এই প্রতিকুল পরিস্থিতি সহ্য করা আমাদের সকলের নাগরিক দায়িত্ব।
সকলের সহনশীলতা ও সরকারের সময়োপযোগী নীতির মাধ্যমে আমাদের যেকোন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব।
– মিয়া মনসফ, যুগ্ম সম্পাদক, মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ)
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

