বিশেষ প্রতিবেদক
রাজধানী ঢাকার বাসিন্দারা যখন কিছুদিনের জন্য খানাখন্দমুক্ত ও চলাচলযোগ্য সড়কের স্বস্তি উপভোগ করতে শুরু করেন, তখনই নতুন কোনো অবকাঠামো প্রকল্পের কারণে আবারও শুরু হয় খোঁড়াখুঁড়ি। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, টেলিযোগাযোগ কিংবা পয়োনিষ্কাশন—বিভিন্ন সংস্থার পৃথক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে প্রায়ই একই সড়ক বারবার কাটতে দেখা যায়। ফলে নগরবাসীর দুর্ভোগ যেমন দীর্ঘায়িত হয়, তেমনি নষ্ট হয় সরকারি অর্থ এবং সড়কের স্থায়িত্বও।
এবার রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি সড়ক কাটার প্রস্তুতি নিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। সংস্থাটির বহুল আলোচিত ‘ঢাকা স্যানিটেশন ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ধাপে ধাপে এসব সড়ক খনন করা হবে। প্রকল্পটি রাজধানীর পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বাস্তবায়ন ঘিরে নতুন করে নাগরিক দুর্ভোগের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এর কাজ শুরু হয়েছে এবং ২০২৮ সালে তা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পে অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি)।
ওয়াসা বলছে, রাজধানীর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে প্রকল্পটি অপরিহার্য। এর আওতায় নতুন করে প্রায় ৫০ হাজার গৃহসংযোগ, পাগলা পয়ঃশোধনাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রতিদিন অতিরিক্ত ১৫ কোটি লিটার বর্জ্য পানি শোধনের সক্ষমতা তৈরি করা হবে।
তবে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও, এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং নাগরিক ভোগান্তি ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমান প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে সমন্বয়ের অভাব নিয়ে। কারণ, মাত্র কয়েক মাস আগেই শেষ হয়েছে ওয়াসার আরেকটি বৃহৎ প্রকল্প—‘ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত ওই প্রকল্পে ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পুরোনো পানির পাইপলাইন প্রতিস্থাপন, নতুন পাইপ স্থাপন এবং সংযোগ উন্নয়নের কাজ করতে গিয়ে ব্যাপক সড়ক খনন করা হয়েছিল। এখন সেই একই নগরীতে আবারও পয়োনিষ্কাশন লাইন বসানোর জন্য নতুন করে রাস্তা কাটতে হচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, পানির সরবরাহ লাইন ও পয়োনিষ্কাশন লাইন—উভয়ই মাটির নিচের অবকাঠামো। পরিকল্পনার শুরুতেই দুটি প্রকল্পের সমন্বয় করা গেলে একই সড়ক বারবার খননের প্রয়োজন পড়ত না।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় প্রায় ৪৫৩ কিলোমিটার এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় প্রায় ৭৬ কিলোমিটার সড়ক খনন করা হবে। ইতোমধ্যে নিউমার্কেট, আজিমপুর, কমলাপুর, মগবাজার, খিলগাঁও ও মতিঝিলের বিভিন্ন এলাকায় কাজ শুরু হয়েছে। এসব এলাকায় যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে এবং অনেক সড়ক আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম মনে করেন, অতীতে একই রাস্তা বারবার কাটার পেছনে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ছিল।
তিনি বলেন, “একই রাস্তা যেন বারবার কাটতে না হয়, সে বিষয়ে আমরা এখন গুরুত্ব দিচ্ছি। বুয়েটের শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে এমন পরিকল্পনা গ্রহণের চেষ্টা করা হবে যাতে ভবিষ্যতে মানুষের দুর্ভোগ কমানো যায়।”
তবে নতুন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম মিঞা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, সমস্যার মূল কারণ প্রযুক্তিগত নয়; বরং প্রশাসনিক ও আর্থিক।
তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া, প্রকল্পভেদে ভিন্ন সময়সীমা, অর্থায়নকারী সংস্থার আলাদা নীতিমালা ও শর্ত, এবং বিপুল অর্থের প্রয়োজনীয়তা সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ঢাকায় বর্ষা মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। এই সময়ে রাস্তা খননকে নগরবাসীর জন্য সবচেয়ে কষ্টকর পরিস্থিতিগুলোর একটি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্ষাকালে খননকৃত স্থানে পানি জমে যায়, কাদা সৃষ্টি হয়, যানজট বাড়ে এবং জরুরি সেবাও ব্যাহত হয়। অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি যানবাহন আটকে পড়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। একই সঙ্গে খনন করা রাস্তা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, যা পরে মেরামতের অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি করে।
নাগরিক দুর্ভোগ কমাতে ২০১৯ সালে ‘ঢাকা মহানগরীর সড়ক খনন নীতিমালা’ প্রণয়ন করা হয়। এতে ডিএনসিসি, ডিএসসিসি, ঢাকা ওয়াসা, তিতাস গ্যাস, ডিপিডিসি, ডেসকো ও বিটিসিএলসহ বিভিন্ন সংস্থার মতামত অন্তর্ভুক্ত ছিল।
নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে— একসঙ্গে পুরো সড়ক খনন করা যাবে না; ১৫ দিনের ধাপে ধাপে কাজ করতে হবে; ধুলা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পানি ছিটাতে হবে; সতর্কীকরণ ফিতা ও সাইনবোর্ড ব্যবহার বাধ্যতামূলক; নির্মাণসামগ্রী রাস্তার ওপর ফেলে রাখা যাবে না; ও বর্ষাকালে (জুন-অক্টোবর) জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সড়ক খনন নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে এসব নির্দেশনা প্রায়ই উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি খিলগাঁওয়ের সিপাহীবাগ টেম্পোস্ট্যান্ড এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ব্যস্ত সড়কের মাঝখানে বড় গর্ত করে চারপাশ টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। ফলে ওই সড়কে যান চলাচল কার্যত বন্ধ।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা জানান, রমজানের আগেই কাজ শুরু হয়েছিল, কিন্তু এখনো শেষ হয়নি। কবে কাজ শেষ হবে বা রাস্তা কখন উন্মুক্ত করা হবে, সে সম্পর্কেও কোনো তথ্যফলক নেই।
ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে, ওই এলাকার কাজ শেষ হতে আরও প্রায় ছয় মাস লাগতে পারে।
একইভাবে নিউমার্কেট এলাকায় পাইপ বসানোর কাজ শেষ হলেও সড়ক এখনো পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। কোথাও মাটি, কোথাও ইট দিয়ে অস্থায়ীভাবে ভরাট করা হয়েছে। এতে পথচারী ও যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
আজিমপুর এলাকার বাসিন্দা সানাউল হক বলেন, “রাস্তা কাটার সময় মানুষের দুর্ভোগের কথা কেউ চিন্তা করে না। অনেক জায়গায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই, সতর্কতামূলক ফিতা নেই, কাজের সময়সীমা লেখা থাকে না। নাগরিকদের যেন কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয় না।”
একই ধরনের মত দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, “একই সড়ক একবার পানির লাইনের জন্য এবং পরে পয়োনিষ্কাশন লাইনের জন্য কাটার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পরিকল্পনাহীনতা, অদক্ষতা ও সমন্বয়হীনতার স্পষ্ট উদাহরণ। এর ফলে শুধু নাগরিক দুর্ভোগই বাড়ছে না, রাষ্ট্রীয় অর্থেরও অপচয় হচ্ছে।”
প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দুই সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে ঢাকা ওয়াসা। সেখানে সড়ক খননের আগে অনুমতি নেওয়া, সময়সূচি প্রদান, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো নিজ খরচে মেরামতের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
সড়ক খনন ও পুনর্নির্মাণ বাবদ দুই সিটি করপোরেশনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৬৩০ কোটি টাকা।
তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, কাগজে-কলমে থাকা শর্ত এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে প্রায়ই বড় ধরনের ফারাক দেখা যায়। ফলে রাজধানীবাসীর প্রশ্ন—এবারও কি উন্নয়নের নামে বছরের পর বছর খোঁড়াখুঁড়ি, যানজট, ধুলাবালি ও দুর্ভোগ সহ্য করতে হবে, নাকি সত্যিই সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি আধুনিক ও টেকসই নগর অবকাঠামো গড়ে উঠবে?
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
