বিশেষ প্রতিবেদন
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যক্রমে শুরুতে উল্লেখযোগ্য গতি দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে তা ধীরে ধীরে কমে স্থবিরতায় রূপ নিয়েছে।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার দুর্নীতিবিরোধী অভিযান জোরদারের ঘোষণা দেয়। এর প্রেক্ষিতে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে দুদকের অনুসন্ধান, মামলা দায়ের এবং চার্জশিট দাখিলে দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়।
দায়িত্ব নেওয়ার পর দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেন, সংস্থাটিকে আর ‘ঘুমন্ত প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে থাকতে দেওয়া হবে না। বড় দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ‘রাঘববোয়াল’ ধরার নীতিতে কাজ করার কথা জানান তিনি। সরকারের নৈতিক সমর্থনে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন বড় অভিযোগে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান, মামলা ও চার্জশিট দাখিল করে কমিশন।
আইন সংশোধনের উদ্যোগ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুদকের ক্ষমতা বাড়াতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রস্তাবে কমিশনার সংখ্যা তিন থেকে বাড়িয়ে পাঁচ করার কথা বলা হয়েছে, যেখানে একজন নারী কমিশনার বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে। পাশাপাশি মানি লন্ডারিংসহ নতুন ধরনের অপরাধ তদন্তে প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর জারি করা হয়েছে, যা সংসদে অনুমোদন পেলে আইনে পরিণত হবে।
প্রথম ১১ মাসে অগ্রগতি
দুদক সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ১১ মাসে মোট ১৬ হাজার ৩২৭টি অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাই শেষে ১২ হাজার ৮২৭টি আমলে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৭৬৮টি অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু হয়, ৩৯৯টি মামলায় রূপ নেয় এবং তদন্ত শেষে ৩২১টি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এসব মামলায় মোট ৫৪৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি ১০টি মামলার মধ্যে গড়ে ৮টিতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, যা অতীতের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শেষের দিকে গতি কমে যায়
তবে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দুদকের কার্যক্রমে গতি কমে যায়। এ সময়ে ২৬০টি নতুন অনুসন্ধান শুরু হয়, ১৪৫টি মামলা দায়ের করা হয় এবং ১১০টি মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পর কমিশন শূন্য হয়ে পড়লে সংস্থাটির কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়।
অভিযোগের ধরন
এ সময়ে যেসব অভিযোগে অনুসন্ধান ও মামলা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে জ্ঞাত আয়ের বাইরে সম্পদ অর্জন, বড় প্রকল্পে দুর্নীতি, প্লট ও জমি বরাদ্দে অনিয়ম, ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ, মানি লন্ডারিং এবং বিদেশে অর্থ পাচার। এসব মামলায় সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আমলা ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও তদন্ত ও মামলা হয়েছে।
দুদকের ব্যাখ্যা
দুদকের উপ-পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, কমিশন শূন্য থাকায় বর্তমানে নতুন কোনও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলমান অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সব মিলিয়ে, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে দুদকের কার্যক্রমে যে গতি দেখা গিয়েছিল, তা শেষ দিকে কমে এলেও প্রাথমিক অগ্রগতি সংস্থাটির সক্ষমতা ও সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করছে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
