আন্তর্জাতিক ডেস্ক
একসময় যাদের বংশের শাসনে পরিচালিত হতো বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা, আজ সেই বংশের সদস্যদেরই নিজেদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। ভাগ্যের এক নির্মম পরিহাসে ভারতের নির্বাচন কমিশন মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের ৩৪৬ জন সদস্যের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। বাদ পড়া এই ব্যক্তিরা ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ-এ সিরাজউদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি এবং পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সহায়তায় বাংলার নবাব হওয়া মীর জাফর-এর বংশধর।
তালিকা থেকে বাদ পুরো পরিবার
মুর্শিদাবাদের লালবাগ নব আদর্শ হাই স্কুলের ১২১ নম্বর বুথে নবাব পরিবারের এসব সদস্য ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিলেন। ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাদের নাম তালিকায় থাকলেও সাম্প্রতিক বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) শেষে তাদের নাম ‘বিচারাধীন’ তালিকায় রাখা হয়। পরে সম্পূরক তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, পরিবারের শত শত সদস্যের নাম বাদ পড়ে গেছে।
‘ছোট নবাব’ নামে পরিচিত ৮২ বছর বয়সী সৈয়দ রেজা আলী মির্জা জানান, শুধু তার নয়, পরিবারের আরও নয়জন সদস্যের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তার ছেলেও রয়েছেন, যিনি একজন পৌর কাউন্সিলর।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিচারাধীন তালিকায় নাম আসার পর আমি প্রয়োজনীয় সব নথি নিয়ে শুনানিতে হাজির হয়েছিলাম। কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছিলেন নাম ঠিক থাকবে। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর দেখি আমার পুরো পরিবারসহ নবাব বংশের কয়েকশ সদস্যের নাম মুছে ফেলা হয়েছে।”
তার ছেলে সৈয়দ মোহাম্মদ ফাহিম মির্জা বলেন, “২০০২ সালের ভোটার তালিকাতেও আমাদের নাম ছিল। এখন কেন বাদ দেওয়া হলো, তা বোধগম্য নয়।”
ভোটাধিকার প্রয়োগে শঙ্কা
পরিবারটির দাবি, তাদের ভারতীয় পরিচয় নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। তারা জানান, দেশভাগের সময় তাদের পূর্বপুরুষ ওয়াসিফ আলি মির্জা পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ভারতে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এমনকি স্বাধীনতার পর কয়েকদিন মুর্শিদাবাদ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও পরে তা ভারতের অংশ হওয়ার পেছনেও তাদের পরিবারের ভূমিকা ছিল বলে দাবি করেন তারা।
তাদের মতে, অতীতে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও তাদের বংশপরিচয় স্বীকৃতি দিয়েছে। “এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে যে আমরা ভারতের নাগরিক?”—প্রশ্ন তোলেন ফাহিম মির্জা।
মীর জাফর-এর ১৫তম প্রজন্মের এই বংশধরেরা লালবাগের কিল্লা নিজামত সংলগ্ন এলাকাতেই বসবাস করেন। ‘ছোট নবাব’ আক্ষেপ করে বলেন, “একসময় আমাদের পূর্বপুরুষেরা প্রজাদের বিচার করতেন। আজ নির্বাচন কমিশন আমাদের বিচার করে ভোটার তালিকা থেকেই বাদ দিয়ে দিলো।”
আগামী ২৩ এপ্রিল মুর্শিদাবাদে প্রথম দফার ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। যদিও ট্রাইব্যুনালে আপিল করার সুযোগ রয়েছে, পরিবারের আশঙ্কা—আইনি প্রক্রিয়া শেষ হতে হতে ভোটগ্রহণ শেষ হয়ে যাবে। ফলে এ বছর তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না।
এ বিষয়ে মুর্শিদাবাদের জেলাশাসক আর অর্জুন জানান, নবাব পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
