বিশেষ প্রতিবেদন
রাজধানীর আব্দুল গনি রোডে অবস্থিত বর্তমান বাংলাদেশ সচিবালয়ের তীব্র জায়গা সংকট ও ক্রমবর্ধমান দাপ্তরিক চাপ কমাতে একটি আধুনিক ২১ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছিল সরকার। প্রায় ৬৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)-এ অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের মূল নকশা অনুসরণ করে পুরো সচিবালয়কে শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ আসায় নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের দ্বিতীয় একনেক সভায় প্রকল্পটি ফেরত দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ শুরুতে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করেছিল। তাদের মতে, বর্তমানে সচিবালয়ে প্রায় ১০ লাখ বর্গফুট অফিস স্পেস থাকলেও চাহিদার তুলনায় তা অনেক কম। অতিরিক্ত অন্তত ৬ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুট জায়গার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় চার তলা বেজমেন্টের ওপর একটি আধুনিক ২১ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেখানে সুপার স্ট্রাকচার নির্মাণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পানি সরবরাহ, সুয়ারেজ ব্যবস্থা, বিদ্যুতায়ন ও গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করার কথা ছিল।
এছাড়া ভবনে থাকত— ভূগর্ভস্থ জলাধার; দুটি ২০০০ কেভিএ সাব-স্টেশন; দুটি ৫০০ কেভিএ ও তিনটি ৪০০ কেভিএ জেনারেটর; কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা; ৬টি প্যাসেঞ্জার লিফট; ৬টি ফায়ার লিফট; ২টি বেড লিফট; আধুনিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা; ও মাল্টিমিডিয়া সুবিধাসম্পন্ন ২০টি কনফারেন্স রুম।
প্রকল্পে নিরাপত্তার জন্য সেফটি ক্যানোপি ও সেফটি নেট ব্যবহারের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবনটি নির্মিত হলে প্রায় ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৩৬ বর্গফুট নতুন অফিস স্পেস তৈরি হতো, যা বর্তমান চাহিদার প্রায় ৪২ দশমিক ৩০ শতাংশ পূরণ করতে পারত।
পরিকল্পনা বিভাগের মতে, সচিবালয় দেশের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, বিদেশি প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিক বিভিন্ন প্রয়োজনে সেখানে আসেন। কিন্তু বর্তমান অবকাঠামো এই বাড়তি চাপ সামাল দিতে পারছে না।
তবে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব শাকিল আখতার মনে করেন, বর্তমান সচিবালয়ের জায়গা অত্যন্ত ঘিঞ্জি ও জনাকীর্ণ হয়ে গেছে। তার ভাষায়, আগামী ৫০ বছরের পরিকল্পনা বিবেচনায় একই জায়গায় একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণ কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
তিনি বলেন, সকালে অফিস শুরুর সময়ে সচিবালয় এলাকায় যানবাহনের চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে পুরো এলাকা প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ করলে এই যানজট আরও ভয়াবহ হতে পারে।
একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন ভবন অনুমোদনের পরিবর্তে শেরেবাংলা নগরে পুরো সচিবালয় স্থানান্তরের সম্ভাবনা যাচাই করার নির্দেশ দেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরকে সাবেক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠসংলগ্ন এলাকায় সচিবালয় স্থানান্তরের সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
পরিকল্পনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শেরেবাংলা নগরে সরকারের পর্যাপ্ত জমি রয়েছে, যেখানে ১০ থেকে ১২টি বহুতল ভবন নির্মাণ করা সম্ভব। তবে সেখানে পুরো সচিবালয় স্থানান্তর করা হলে জনসমাগম ও যানবাহনের চাপ কতটা বাড়বে, তা নিয়ে বিস্তারিত কারিগরি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ওই এলাকায় ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদ ভবন অবস্থিত এবং নিয়মিত শত শত সংসদ সদস্য ও কর্মকর্তা সেখানে যাতায়াত করেন। এছাড়া আগারগাঁও ও শেরেবাংলা নগর এলাকায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরও রয়েছে। ফলে সচিবালয় সরিয়ে নেওয়া হলে ওই অঞ্চলে নতুন করে তীব্র যানজট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, বর্তমান সচিবালয়ের সীমিত জায়গায় বারবার নতুন ভবন নির্মাণের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত প্রশাসনিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলাই বেশি কার্যকর হবে।
এ কারণেই এখন নতুন ২১ তলা ভবন নির্মাণের পরিবর্তে শেরেবাংলা নগরে আধুনিক প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তোলার বৃহৎ পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। গণপূর্ত বিভাগের সম্ভাব্যতা যাচাই ও ট্রাফিক বিশ্লেষণ প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

