বিশেষ প্রতিবেদক
দীর্ঘ ২৩ মাস অপেক্ষার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের (বিএনপির যুব সংগঠন) ১৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হলেও এতে স্থান পাননি রাজপথে সক্রিয় থাকা অনেক পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতা। কমিটি ঘোষণার পরপরই সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে অসন্তোষ, ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, কেউ কেউ তদবির ও প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন।
তবে যুবদলের শীর্ষ নেতারা বলছেন, সংগঠন অনেক বড় এবং মাত্র ১৫১ সদস্যের একটি কমিটিতে সবাইকে স্থান দেওয়া অত্যন্ত কঠিন একটি বিষয়।
সংগঠনের একটি অংশের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা, নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হওয়া এবং মাঠে থাকা অনেক নেতাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। বরং ব্যক্তিগত আনুগত্য, তদবির এবং নির্দিষ্ট কিছু বলয়ের প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে তারা দাবি করছেন।
পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর বাদ পড়া নেতারা গুলশান ও নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। শনিবারও বঞ্চিত নেতারা দলীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। এ সময় তারা রাজপথের আন্দোলনে ভূমিকা রাখা নেতাদের স্বীকৃতির দাবিতে স্লোগান দেন এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের দাবি জানান।
দলীয় সূত্র ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে আন্দোলনে সক্রিয় থাকা কয়েকজন নেতা নতুন কমিটিতে স্থান পাননি। এতে তাদের অনুসারীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
নেতাকর্মীদের দাবি, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে প্রায় সব বিরোধী আন্দোলনে এসব নেতার অনেকে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পরও নতুন কমিটিতে তাদের জায়গা না পাওয়া অনেককে বিস্মিত করেছে।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মেজবাউল আলম এই প্রতিবেদককে বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে অনেক অযোগ্য ব্যক্তিকে পদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা গত ১৫ বছর জীবন বাজি রেখে রাজপথে আন্দোলন করেছি, জেল-জুলুম সহ্য করেছি। কিন্তু আমাদের অনেককেই যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। আমরা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি, তিনি তরুণদের গর্ব এবং আমাদের অবদান অবশ্যই মূল্যায়ন করবেন।”
যুবদলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ মাসুদ বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের অবদান বিবেচনা করে সম্মানিত করা হবে। আমরা ন্যায্যতার প্রত্যাশা করি।”
নতুন কমিটিতে স্থান না পাওয়া নেতাদের মধ্যে রয়েছেন যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি মামুন খান, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. দুলাল হোসেন ও রিয়ন তালুকদার, সাবেক সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মেহবুব মাসুম শান্ত, কুমিল্লা বিভাগের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ভিপি তাজুল ইসলাম, ওলি উদ্দিন সুমন দেওয়ান, ডা. বাছেদুর রহমান সোহেল, সাবেক সহ-ক্রীড়া সম্পাদক আমান উল্লাহ বিপুল, সাবেক সহ-ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক মেহেদী হাসান, বরিশাল বিভাগের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সুমন দে, প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুর রহিম, সাবেক সদস্য শফিউল বাসার সজল, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান হাফিজ, সাবেক ছাত্রদল নেতা তাবিবুর রহমান সাগর, সাইফুল ইসলামসহ অনেকে।
এছাড়াও ছাত্রদলের সাবেক বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাও নতুন কমিটিতে জায়গা পাননি। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সহ-সভাপতি রফিকুল ইসলাম রফিক, হুমায়ুন কবির, সাজ্জাদ হোসেন উজ্জ্বল ও জাকির খান; সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসান, মিজানুর রহমান সোহাগ ও মাহফুজুর রহমান; সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক কাজী মেজবাউল আলম ও সুলতান মাহমুদ তুষার; সাবেক সহ-সম্পাদক খালেদ মাহমুদ মাসুদ ও আনোয়ার জাহিদ; সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম, গোলাম আজম সৈকত ও মাসুদ সরকারসহ আরও অনেকে।
নেতারা বলছেন, বিএনপি বিরোধী দলে থাকা সময়ে এসব নেতার অনেকে একাধিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন এবং হামলা, গ্রেপ্তার ও মামলার শিকার হয়েছেন।
তাদের অভিযোগ, কঠিন সময়ে যারা মাঠে থেকে দলের কর্মসূচি বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছেন, নতুন কমিটিতে তাদের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
নতুন কমিটির কয়েকটি পদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, বিএনপি বা সহযোগী সংগঠনে উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক ইতিহাস না থাকা কয়েকজন ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন।
সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফুর রহমান সোহেলকে নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। নেতাকর্মীদের দাবি, তার আগে কোনো সাংগঠনিক পদ না থাকলেও তাকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন না।
কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেন, সাংগঠনিক যোগ্যতা, ত্যাগ ও আন্দোলনের ভূমিকার চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও তদবির বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
নতুন কমিটির এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রায় ১৭ বছরের আন্দোলনে মনিরুল ইসলাম সোহাগকে রাজপথে ১৭ মিনিটও দেখা যায়নি। অথচ তাকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। একইভাবে গোলাম মোস্তফাও দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় ছিলেন, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন।”
তিনি বলেন, “যারা কঠিন সময়ে মাঠে ছিলেন, গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের অনেকেই মূল্যায়ন পাননি।”
নতুন কমিটির ২ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে নিয়েও কিছু নেতাকর্মী প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের সময়ে তাকে সক্রিয়ভাবে দেখা যায়নি এবং গত ১৭ বছরে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও তাকে দেখা যায়নি। এরপরও তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তারা। একই অভিযোগ উঠেছে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া খন্দকার আল আশরাফ মামুনকে নিয়েও।
কমিটি ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, দলীয় গ্রুপ এবং সাংগঠনিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক আসাদুল আলম তিতু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশা প্রকাশ করে লিখেছেন, “রাজপথ কেন আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল? আমরা এর জবাব চাই।”
বঞ্চিত নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে কম পরিচিত বা নিষ্ক্রিয় ব্যক্তিদের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, এর ফলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে এবং সাংগঠনিক মনোবলে প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এ বিষয়ে যুবদল সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না বলেন, “আমরা চেষ্টা করেছি যোগ্য, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করে কমিটিতে জায়গা দিতে। কিন্তু ১৫১ সদস্যের কাঠামোর মধ্যে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। সারা দেশে আমাদের হাজার হাজার যোগ্য নেতা রয়েছেন।”
নতুন কমিটিতে স্থান না পাওয়া নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমরা সবাই নেতা। সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতার কারণে যারা অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি, তারাও আমাদের পথচলার অংশ। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আমরা সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাব।”
কমিটি ঘোষণার পর শুরু হওয়া অসন্তোষ ও বিতর্ক সংগঠনের অভ্যন্তরে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখন দেখার বিষয়। তবে নতুন নেতৃত্ব ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনার মুখে পড়েছে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
