এমএনএ ডেস্ক রিপোর্ট : কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসন থেকে নির্বাচিত সরকারদলীয় কীর্তিমান এমপি আবদুর রহমান বদি নানা বদ কর্মকান্ডের কারণে আলোচিত-সমালোচিত। তিনি বিভিন্ন সময় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সরকারি কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, শিক্ষক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজনকে মারধর ও নির্যাতন করেছেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে রয়েছে চোরাচালান, ইয়াবা পাচার, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ।
টেকনাফ স্থলবন্দরে পণ্য আমদানি-রফতানি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, সীমান্তে চোরাই পণ্য ও ইয়াবা ব্যবসা থেকে বখরা আদায়, সেন্টমার্টিন নৌপথে পর্যটকবাহী জাহাজ থেকে চাঁদা আদায়সহ নানা দুর্নীতির মাধ্যমে বদি এখন বিপুল অর্থবিত্তের মালিক। কর ফাঁকি দিয়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগে দুদকের মামলায় অবশেষে সাজা হলো বহুল আলোচিত এই এমপির।
ইয়াবা পাচার : ইয়াবা ব্যবসায়ী ও গডফাদারদের ৭৬৪ জনের তালিকা তৈরি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তালিকায় এমপি বদির নাম রয়েছে। ওই তালিকায় তাকে প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও তার ছত্রছায়ায় ইয়াবা ব্যবসা চলছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছে বদির পাঁচ ভাই ও এক বোনের নাম। তারা হলেন- আবদুল আমিন, আবদুল শুক্কুর, মৌলভী মুজিবুর রহমান, মো. শফিক, মো. ফয়সাল ও শামসুন্নাহার। এ ছাড়া তালিকায় রয়েছে এমপি বদির চাচাতো ভাই মো. আলম, ফুফাতো ভাই কামরুল ইসলাম রাসেল, খালাতো ভাই মং মং সেন, ভাগিনা সাহেদুর রহমান নিপু, বেয়াই আবদুল জব্বার, আকতার কামাল, সাহিদ কামাল, মোয়াজ্জেম হোসেন দানু, জসিম উদ্দিন রাব্বানী, সৈয়দ হোসেন মেম্বার, জামাল হোসেন, নুরুল আলম, জাহিদ হোসেনের নাম।
মানব পাচার : এখন বন্ধ হয়ে গেলেও এক সময় উখিয়া-টেকনাফের নৌপথে ব্যাপক হারে মানব পাচার হয়েছে। মানব পাচারে জড়িতদের যে তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে করা হয়েছে তাতে আবদুর রহমান বদিসহ তার আত্মীয়-স্বজনের নাম রয়েছে। বদির সহযোগিতায় মানব পাচারের কথা উল্লেখ রয়েছে প্রতিবেদনে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই তালিকায় মানব পাচারকারীর গডফাদার হিসেবে তার ছোট ভাই মৌলভী মুজিবুর রহমানের নাম এক নম্বরে।
তালিকায় তার আত্মীয়দের মধ্যে বোন শামসুন্নাহারের ছেলে সাহেদুর রহমান নিপু, বোনের দেবর হামিদ হোসেন, আক্তার কামাল, শাহেদ কামাল, জসিম উদ্দিন রাব্বানী, মোয়াজ্জেম হোসেন দানু, ফুফাতো ভাই সৈয়দ আলম, নুরুল আলম নুরা ও ভাগিনা শামীম ওরফে হাসুর নাম রয়েছে।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দাতা : রোহিঙ্গাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া এবং তাদের নাগরিক সনদ দিয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেতে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে এমপি বদির বিরুদ্ধে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি এবং জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে সহায়তাকারীদের একটি তালিকা করেছে নির্বাচন কমিশন। ওই তালিকায় রয়েছে এমপি আবদুর রহমান বদির নাম। তার ছোট ভাই মুজিবুর রহমানের নামও রয়েছে এই তালিকায়।
স্থলবন্দরে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি : টেকনাফ স্থলবন্দরে সীমান্ত বাণিজ্যের পণ্য পরিবহনে ট্রাকপ্রতি ৫শ’ টাকা চাঁদা আদায় হয়। এ থেকে ২শ’ টাকা এমপির জন্য আদায় করা হয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। কক্সবাজার ট্রাক ও মিনি ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের একাধিক নেতা স্বীকার করেছেন, আদায় করা চাঁদার সিংহভাগ পাচ্ছেন স্থানীয় এমপি এবং তার সমর্থনপুষ্ট নেতারা। কক্সবাজার জেলা ট্রাক মালিক গ্রুপের এক নেতা জানিয়েছেন, স্থলবন্দর থেকে প্রতিদিন পণ্যবোঝাই অর্ধশত ট্রাক ছেড়ে যায়। ট্রাকপ্রতি ৫শ’ টাকা চাঁদা আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি জানান, শ্রমিকদের জন্য এই টাকা আদায় হলেও এর সামান্য অংশ তারা পাচ্ছে। সিংহভাগ টাকা যাচ্ছে এমপির পকেটে।
দলীয় কোন্দলে বদি : টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগ দু’ভাগে বিভক্ত। একদিকে রয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মো. আলী ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশরসহ একাধিক নেতা। অন্যদিকে বিতর্কিত এমপি আবদুর রহমান বদি ও আওয়ামী লীগে নবাগত বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদসহ বদির অনুসারীরা। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক মো. আলী জানিয়েছেন, এমপির সঙ্গে নেতাদের কোন্দলের প্রভাব পড়েছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সহযোগী সংগঠনের মধ্যে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যক্রম। ক্ষুণ্ন হচ্ছে দলের ভাবমূর্তি।
আলোচিত-সমালোচিত এমপি বদি :২০০৮সালে প্রথম সংসদ সদস্য হওয়ার দেড় মাসের মধ্যে নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা ব্যাংক কর্মকর্তা গিয়াস উদ্দিনকে পিটিয়ে প্রথম আলোচনায় আসেন বদি। এরপর বন বিভাগের কর্মকর্তা হাজি মুজিবুল হককে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেন। এ ছাড়া তার হাতে মার খেয়েছেন টেকনাফের মুক্তিযোদ্ধা মো. মোস্তফা, আইনজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অ্যাডভোকেট রাখাল মিত্র, শিক্ষক আবদুল জলিল ও পুলিন দে। রক্ষা পাননি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল হালিম ও উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোলামুর রহমান, শামলাপুর হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাস্টার আবুল মনজুর, কক্সবাজারের ঠিকাদার (সিআইপি) আতিকুর রহমান, টেকনাফের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুর রহমান, উখিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মোস্তফা মিনহাজসহ অনেকে।
টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে এমপি বদির হাতে লাঞ্ছিত হন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈ সিং। এ ছাড়া মারধরের শিকার হয়েছেন টেকনাফ স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী আনোয়ার, কামরুজ্জামান, আবদুর রহমান। বদির কথা না শোনায় তার ক্যাডারদের হাতে নাজেহাল হন টেকনাফ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিক মিয়া। এসব ঘটনায় এমপির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় আন্দোলন ও মামলা হয়েছে।
বাবার প্রভাব, বদির উত্থান : আবদুর রহমান বদির বাবা এজাহার মিয়া কোম্পানি টেকনাফ সদরের ইউপি চেয়ারম্যান এবং সীমান্ত এলাকার ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ছিলেন। জানা গেছে, বাবার প্রভাব-প্রতিপত্তির সূত্র ধরে বদিও হয়ে ওঠেন সীমান্ত এলাকার আলোচিত ব্যক্তি। ১৯৮৮ সালে চোরাই পণ্যবাহী একটি ট্রাক উখিয়ার ঘাট কাস্টমস স্টেশনে আটক করা হলে কাস্টমস
কর্মকর্তাকে মারধর করে অপহরণ করা হয়। বিডিআর অভিযান চালিয়ে টেকনাফ থেকে উদ্ধার করে ওই কাস্টমস কর্মকর্তাকে। ওই ঘটনায় জাতীয় পার্টির নেতা এজাহার মিয়ার বিরুদ্ধে মামলাও হয়। মামলাটি এক সময় আদালতে ওঠে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে মামলার প্রধান সাক্ষী বা ভিকটিমের অপমৃত্যু হয়। পরে বলা হয়েছে, ভিকটিম কাস্টমস কর্মকর্তা ঢাকার বাসার তিনতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন। অপমৃত্যুর রহস্য আজও উদ্ঘাটিত হয়নি।
এরশাদ সরকারের পতন হলে পিতা-পুত্র যোগ দেন বিএনপিতে। সে সময় বিএনপির এমপি শাহজাহান চৌধুরীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন ছিলেন তারা। অভিযোগ রয়েছে, এমপি শাহজাহান চৌধুরী তাদের সহযোগিতা করতেন। ফলে বিএনপি সরকারের সময় তারা ছিলেন নিরাপদে। ১৯৯২ সালে বদি এবং তার বাবার বিরুদ্ধে কাস্টমস অফিস লুটের অভিযোগ উঠলেও ওই ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে থানায় কোনো মামলা হয়নি।
১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনের আগে শাহজাহান চৌধুরীকে হটিয়ে বিএনপির মনোনয়ন পান আবদুর রহমান বদি। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র নেতা (অব.) কর্নেল অলি আহমেদের হস্তক্ষেপে বদির মনোনয়ন বাতিল করে শাহজাহান চৌধুরীকে দেওয়া হয়। এ সময় ক্ষোভে-অপমানে বিএনপি ত্যাগ করে বদি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে এজাহার মিয়া কোম্পানি বিএনপির পক্ষে এবং আবদুর রহমান বদি আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নেন। ফলে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও তাদের আধিপত্য অক্ষুণ্ন থাকে।
২০০২ সালে টেকনাফ পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বদি। এই সময়ও নানা অনৈতিক কাজের অভিযোগ রয়েছে বদির বিরুদ্ধে। শফিকা বেগম নামে বিচারপ্রার্থী এক গৃহবধূকে আটক রেখে ধর্ষণের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে
মামলা হয়। পরে ওই গৃহবধূকে অপহরণের অভিযোগে আরও একটি মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। এভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমল পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন অভিযোগে দুই ডজন মামলা হয়।
একাধিক সূত্র জানায়, বদির বিরুদ্ধে মামলার বাদী শফিকা বেগম অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে খুন হন। মামলার কাজে মাকে নিয়ে ট্রেনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফেরার সময় রহস্যজনকভাবে শফিকা খুন হন। পরে চট্টগ্রামে রেলওয়ের জমিতে ওই গৃহবধূর লাশ পাওয়া যায়। এর আগে এক গৃহকর্মীকে হত্যা করে তার লাশ বস্তাবন্দি করে নাফ নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এমপির বিরুদ্ধে। এসব কারণে বদি গ্রেপ্তার হন। পরে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি মুক্তি পান এবং আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বাগিয়ে নেন। এক সময়ের ঘনিষ্ঠজন বিএনপি নেতা শাহজাহান চৌধুরীকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন বদি।
মিশ্র প্রতিক্রিয়া : আদালতের রায়ে কক্সবাজার জেলায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল মোস্তফা জানান, দেশে আইন বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করছে- এটি বড় উদাহরণ।
তিনি বলেন, আইন নিজস্ব গতিতে চলে। বর্তমান সরকারের সময় নিরপেক্ষভাবে বিচার ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, এলাকার এমপি কারাগারে থাকায় দলীয় নেতাকর্মীরা মর্মাহত। এ ঘটনা সরকারের জন্য বিব্রতকর। আশা করি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি মুক্ত হবেন।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

