জাতীয় পরিচয়পত্রে স্বামীর পদবি থাকছে না নারীদের
Posted by: News Desk
March 21, 2018
এমএনএ রিপোর্ট : জাতীয় পরিচয়পত্রে বিবাহিত হিন্দু নারীদের নামের সঙ্গে স্বামীর নামের অংশ বা পদবি ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কোন নারী বিয়ের পরে তার স্বামীর নামের অংশ বা স্বামীর বংশ পদবী জাতীয় পরিচয়পত্রে যুক্ত করতে চাইলে পরিচয়পত্রে তা উল্লেখ থাকবে না। এক্ষেত্রে এসএসসি’র সনদের নাম ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মাধ্যমিকের শিক্ষা সনদ অনুযায়ী যে নাম, সেটাই জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকবে। তবে যাদের সার্টিফিকেট নেই বা বিশেষ প্রয়োজনে নামের সঙ্গে স্বামীর বংশ যুক্ত করতে চান, জাতীয় পরিচয়পত্রে তাদের নাম সংশোধনে কমিশনের অনুমোদন নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়।
কমিশন থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষা সনদে যে নাম থাকবে সেটাই জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) ব্যবহার করতে হবে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এ সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা ধর্মীয় আচারের ওপর হস্তক্ষেপ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন্স) মো. আবদুল বাতেন বলেন, কমিশন সিদ্ধান্ত দিয়েছে, বিবাহিত হিন্দু নারীদের নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শিক্ষা সনদ হুবহু অনুসরণ করতে হবে। সনদ ছাড়া সংশোধন হবে না। এতে শিক্ষা সনদে যে নাম থাকবে তা বিয়ের পরে পরিবর্তন করে স্বামীর নামের পদবি ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না।
কারণ এটা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। যাদের শিক্ষা সনদ থাকবে না, তাদের ক্ষেত্রে অন্য কাগজপত্র দাখিল করতে হবে। আবেদনের ‘মেরিট’ দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কোনো আবেদন জরুরি এবং জটিল হলে সিদ্ধান্তের জন্য কমিশনের সভায় তুলতে হবে। একই রীতি অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
তিনি বলেন, হিন্দু নারীদের অনেকের বিয়ে নিবন্ধন হয় না। যে কারণে নাম যাচাই করার ক্ষেত্রে জটিলতা হয়। তিনি বলেন, শুধু হিন্দু নারী নয় সব ধর্মের নারীদের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হবে। আর যারা ধর্মান্তরিত হয়ে নাম পরিবর্তন করতে চাইবেন তাঁদের আগে শিক্ষা সনদে নাম পরিবর্তন করতে হবে।
ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ সূত্র জানায়, মিতা সরকার নামের একজন নারী তাঁর নামের পদবি পরিবর্তনের আবেদন করেন ইসিতে। তাঁর স্বামীর নাম রাজীব সিংহ রায়। মিতা নামের সঙ্গে স্বামীর গোত্র পদবি সিংহ রায় নিতে নাম পরিবর্তন করে মিতা সিংহ রায় করতে চান। জাতীয় পরিচয়পত্রে দেয়া তথ্য অনুযায়ী মিতা সরকার স্নাতক পাশ।
মিতা সরকার নিজ নাম সংশোধনের জন্য তাঁর হলফনামায় উল্লেখ করেন, সনাতন ধর্মের রীতিনীতি অনুযায়ী মেয়েদের বিয়ের পর স্বামীর গোত্রে গোত্রান্বিত হয়। তাই পরিচয়পত্রে মিতা নামের পরে সরকার (পিতার গোত্র) বাদ দিয়ে সেখানে সিংহ রায় (স্বামীর গোত্র) প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন।
এ আবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আবেদনকারী স্নাতক পাস। যে মন্দিরে বিয়ে হয়েছে সেখান থেকে প্রমাণপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। কার্যপত্রে এ আবেদনকারীর বিষয়টি উল্লেখ করে আরও বলা হয়, হিন্দু বিবাহিত নারীদের কাছ থেকে স্বামীর পদবি ধারণের এমন অসংখ্য আবেদন পাওয়া যাচ্ছে। তারা সন্তানের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদে, জন্মনিবন্ধনে বাবা-মায়ের নাম (বাবার পদবিসহ) উল্লেখ করেন। এমন অবস্থায় মায়ের শিক্ষা সনদে বাবা/স্বামীর পদবি না থাকলেও স্বামী/বাবার পদবি দিয়ে মায়ের পরিচয়পত্র সংশোধন হবে কি-না, এ বিষয়ে কমন সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
এই অবস্থায় জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক মতামত দেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারীরা বিয়ের পর স্বামীর পদবি ধারণ করেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারীদের নামের সংশোধনী চেয়ে প্রচুর আবেদন আসে। তাঁরা তাদের সন্তানের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদে বা জন্ম নিবন্ধনে বাবা মায়ের নাম পদবীসহ উল্লেখ করেন। এমন পরিস্থিতিতে মায়ের শিক্ষাসনদে বাবার/স্বামীর পদবী না থাকা সত্ত্বেও স্বামী বা বাবার পদবি দিয়ে জাতীয় পরিচয় পত্র সংশোধন করা হবে কি না, এ বিষয়ে একটি সার্বজনীন সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। শিক্ষা সনদে স্বামীর পদবী না থাকায় যদি জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন না হয় তাহলে সন্তানদের শিক্ষা সনদ অনেক সময় অকার্যকর হয়ে যায়, জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়েও সমস্যা তৈরি হয়। আবার শিক্ষা সনদ থাকলে নাম বা অন্যান্য ক্ষেত্রে শিক্ষা সনদের সঙ্গে মিল না করে সংশোধন হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
মূল নাম অপরিবর্তিত রেখে হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে নামের শেষাংশে শুধু পিতার গোত্রের পরিবর্তে স্বামীর গোত্র প্রতিস্থাপন করে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করা যায় কি না, এ বিষয়ে ইসির সিদ্ধান্ত চাওয়া হয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ থেকে। কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এসএসসি শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ থাকলে কেবল এনআইডি সনদ অনুযায়ী সংশোধন করা যাবে। তাছাড়া যাদের সনদ নেই, তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দলিলপত্র নিয়ে দরখাস্ত করলে বিবেচনা করবে কমিশন। এরপ্রেক্ষিতে ইসি সার্টিফিকেট অনুযায়ি মিতার নাম সংশোধনের নির্দেশনা দেয়।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, হিন্দু ধর্মাবলাম্বী নারীর বিয়ের পর সাধারনত: তার নামের সঙ্গে স্বামীর গোত্র পদবী যুক্ত করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে মুসলিম নারীরাও নামের সঙ্গে স্বামীর বংশপদবী যুক্ত করতে চান। এসব দিক বিবেচনায় রেখে কমিশনে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। কমিশন সার্টিফিকেট অনুযায়ি নাম সংশোধনের সিদ্ধান্ত দিয়েছে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে কমিশনের অনুমোদন নিয়ে নাম সংশোধন করা যাবে।
এ বিষয়ে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত মনে করেন, বিয়ের মাধ্যমে হিন্দু নারীরা বাবার গোত্র থেকে স্বামীর গোত্রে চলে যায়। তাই স্বামীর গোত্র বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। এতে লাখ লাখ হিন্দু নারী অবর্ণনীয় হয়রানির শিকার হবেন। তাদের সামাজিক জীবনে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হবে।
শত শত বছর ধরে ধর্মীয় রীতিনীতির অংশ হিসেবে বিয়ের পরে হিন্দু নারীরা স্বামীর পদবি ব্যবহার করে আসছেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনে এনআইডি বর্জন করা হবে; কিন্তু স্বামীর নামের অংশ বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। তার মতে, ২০০৮ সালে ভোটার তালিকার জন্য নাম-ঠিকানা নেওয়া হয়েছিল। তখন কেউ সনদপত্র মিলিয়ে নাম অন্তর্ভুক্ত করেননি। ভোটার তালিকার জন্য নাম সংগ্রহ করে; পরে এনআইডি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ধর্মীয় আচার একজন মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা। এটা আইন করে বন্ধ করা যায় না। তবে একজন মানুষের একটি নামই থাকা উচিত। সেক্ষেত্রে ইসি সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিকে সুযোগ দিতে পারে, তিনি কোন নামটি ব্যবহার করবেন।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পুরোহিত তপন ভট্টাচার্য বলেন, একজন নারী কুমারী থেকে বিয়ের মধ্য দিয়ে শ্রীমতি হয়ে স্বামীর দায়িত্বে চলে যান এবং তার উপাধি গ্রহণ করেন। যেদিন থেকে বিয়ে প্রথা শুরু সেদিন থেকেই এটা চালু রয়েছে।
এদিকে ইসির যুগ্ম সচিব আবদুল বাতেন জানান, মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে শিক্ষা সনদের বাইরেও কিছু ডকুমেন্ট যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে। বিয়ের কাবিননামা অথবা ওয়ারিশ সার্টিফিকেট যাচাই করে নাম পরিবর্তন করা যায়। কিন্তু হিন্দু নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের কোনো লিখিত কাগজপত্র বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না। তাই তাদের নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনেক জটিলতার সৃষ্টি হয়।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাৎ হোসেন চৌধুরী বলেন, ব্যক্তি জীবনে ধর্মীয় আচারের অংশ হিসেবে কার কী নাম হবে, তা কমিশনের এখতিয়ার নয়। একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই অফিসিয়াল ব্যবহারে একটি নাম রাখতে হবে। বিয়ের আগে ও পরে সেই নাম পরিবর্তনযোগ্য হতে পারে না। পৃথিবীর কোথাও এ সুযোগ নেই। তা সব ধর্মের জন্যই প্রযোজ্য। অতীতে যারা স্বামীর পদবি নিজের নামের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন, তারা সংশোধনের সুযোগ পাবেন। যথাযথ কাগজপত্র দাখিল করলে ইসি অবশ্যই আবেদনকারীদের নাম সংশোধন করে দেবে বলেও জানান তিনি।
জাতীয় নারীদের পদবি থাকছে না পরিচয়পত্রে স্বামীর 2018-03-21