Don't Miss
Home / অর্থনীতি / জীবন বিমা খাতে বকেয়া দাবির পাহাড়, আস্থার সংকটে পুরো সেক্টর

জীবন বিমা খাতে বকেয়া দাবির পাহাড়, আস্থার সংকটে পুরো সেক্টর

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

বিমাকে বলা হয় বিপদের বন্ধু—দুর্যোগ, অনিশ্চয়তা কিংবা জীবনের কঠিন সময়ে আর্থিক সুরক্ষার এক নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। কিন্তু সেই নির্ভরতার জায়গাটিই এখন প্রশ্নবিদ্ধ। দেশে জীবন বিমা খাতে ক্রমবর্ধমান বকেয়া দাবির কারণে গ্রাহকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ, আর পুরো খাত জুড়ে দেখা দিয়েছে আস্থার সংকট।

২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশের জীবন বিমা কোম্পানিগুলোতে প্রায় ১২ লাখ গ্রাহকের ৪ হাজার ৪০৩ কোটি ২০ লাখ টাকার দাবি বকেয়া পড়ে রয়েছে। বছরজুড়ে গ্রাহকরা মোট ১৩ হাজার ১৫৮ কোটি ৫ লাখ টাকার দাবি উত্থাপন করলেও পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ৮ হাজার ৭৫৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৪১ দশমিক ৬৯ শতাংশ গ্রাহক তাদের প্রাপ্য অর্থ পাননি।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির জন্য দায়ী মূলত কয়েকটি সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির একাই বকেয়া দাবি ৩ হাজার ২২৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, যা মোট বকেয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি ৬ লাখের বেশি গ্রাহকের বিপুল অঙ্কের দাবি উত্থাপনের বিপরীতে খুবই সামান্য অংশ পরিশোধ করেছে।

এছাড়া পদ্মা ইসলামী লাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ, প্রোগ্রেসিভ লাইফ, ডেল্টা লাইফসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের দাবি বকেয়া রয়েছে। কিছু কোম্পানিতে বকেয়ার হার ৯০ শতাংশেরও বেশি।

রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বীমা কর্পোরেশনেও ৬৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকার দাবি বকেয়া রয়েছে। তবে তারা তুলনামূলকভাবে বড় অংশের দাবি পরিশোধ করেছে। অন্যদিকে বিদেশি কোম্পানি মেটলাইফে বকেয়া রয়েছে ৪৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা, যদিও মোট দাবির তুলনায় তাদের পরিশোধ হার অনেক বেশি।

শুধু দাবি পরিশোধে ব্যর্থতাই নয়, অনেক কোম্পানির বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘন করে ব্যবস্থাপনা খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগও রয়েছে। ৩৫টি বেসরকারি জীবন বিমা কোম্পানির মধ্যে ২০টি ২০২৫ সালে নির্ধারিত সীমার বাইরে ব্যয় করেছে। উদাহরণ হিসেবে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ নির্ধারিত সীমার চেয়ে প্রায় ২৮ কোটি টাকা বেশি খরচ করেছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে হয়রানি ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিমা খাতে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন গ্রাহক বিমা করতে আগ্রহী হচ্ছেন না, প্রিমিয়াম আয় কমে যাচ্ছে, এবং এর প্রভাব পড়ছে পুরো শিল্পে।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এস এম নুরুজ্জামান বলেন, “অল্প কিছু দাবি বকেয়া থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রায় ১২ লাখ গ্রাহকের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। গুটিকয়েক কোম্পানির কারণেই পুরো খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

প্রগতি লাইফের সিইও মো. জালালুল আজিম বলেন, “বছরের শেষে কিছু দাবি সাময়িকভাবে অনিষ্পন্ন থাকতে পারে, কিন্তু এত বড় অঙ্কে বকেয়া থাকা অস্বাভাবিক। সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানিগুলোকে পুনর্গঠন বা মার্জ করা দরকার।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট কাটাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে— গ্রাহকের দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা; অনিয়মকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা; প্রয়োজনে সম্পদ বিক্রি করে বকেয়া পরিশোধ; দুর্বল কোম্পানিগুলোকে একীভূত (মার্জ) করা; ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি।

সব কোম্পানির চিত্র অবশ্য নেতিবাচক নয়। আকিজ তাকাফুল লাইফ, আলফা লাইফ, মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফসহ কয়েকটি কোম্পানি শতভাগ দাবি পরিশোধ করে ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করেছে।

জীবন বিমা খাতের মূল ভিত্তি হলো আস্থা। কিন্তু বিপুল বকেয়া দাবি, অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সেই ভিত্তি এখন নড়বড়ে। দ্রুত সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে, এই খাতের ওপর মানুষের বিশ্বাস আরও কমে যেতে পারে—যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো অর্থনীতির জন্যই নেতিবাচক সংকেত।

x

Check Also

নিজের শহর পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নাগরিকদেরও, বগুড়ায় সিটি করপোরেশনের উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী

এমএনএ প্রতিবেদক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সোমবার বগুড়ায় একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বগুড়া সিটি করপোরেশনের ...