দেশজুড়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের ঢেউ
Posted by: News Desk
April 9, 2018
এমএনএ ক্যাম্পাস রিপোর্ট : কোটা সংস্কার নিয়ে চলমান আন্দোলন থমথমে থাকার পর আজ সোমবার দুপুরের দিকে ফের গতি পেয়েছে। ঢাবির সাথে তাল মিলিয়ে দেশজুড়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে আন্দোলনের ঢেউ উঠেছে।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকার বাইরে আন্দোলন করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীরা কোটার সংস্কারের পাশাপাশি ঢাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার বিচার দাবিও করছেন।
এছাড়াও ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একই দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা।
কোথাও স্লোগান দিয়ে মিছিল বের হচ্ছে, কোথাও আবার শিক্ষার্থীরা সমবেত হয়ে ব্যানার ফেস্টুন বানাচ্ছেন। আবার কোনো ক্যাম্পাসে ক্লাস বর্জন করে মহাসড়কে অবস্থান করছেন শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রার্থীরা। তাদের দাবি কোটা বাতিল নয় বরং যৌক্তিক সংস্কার। আর সারাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একডেমিক কার্যক্রম মূলত অকেজো হয়ে পড়েছে।
সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের মিছিলে ফের উত্তেজনা বিরাজ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। আজ সোমবার যতই বেলা বাড়ছে ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে ক্যাম্পাস। এ সময় আন্দোলনকারীরা স্লোগানে স্লোগানে ঢাবি ক্যাম্পাস প্রকম্পিত করে তুলছেন।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা পৌনে ১২টার দিকে দোয়েল চত্বর থেকে মিছিল সহকারের টিএসসির হয়ে কার্জন হলের সামনে অবস্থান নেয়। এখানে অন্যান্য দিকে থেকেও ছাত্ররা জড়ো হয়ে পড়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সড়ক হয়ে আবারও দোয়েল চত্বর দিকে যান।
মিছিলে অংশ নিয়েছে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। তবে শিক্ষার্থী পুলিশের অবস্থানের দিকে যাননি। সময় ব্যবধানে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) ঘিরে চারটি রাস্তাই বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে টিএসসি থেকে শাহবাগ, দোয়েল চত্বর, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল ও নীলক্ষেত-নিউমার্কেটমুখী চারটি রাস্তাতেই যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। তবে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দিতে কাঁদানে গ্যাস ছুড়ছে পুলিশ। সে কারণে ফের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
আজ সোমবার দুপুর দেড়টার পর আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ব্যারিকেড দিয়ে টিএসসির চার দিকের রাস্তা বন্ধ করে দেন। এসময় গণমাধ্যমের গাড়িসহ সব ধরনের যানবাহন ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। ঘুরিয়ে দেওয়া হয় অ্যাম্বুলেন্সও।
খানিকবাদে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দিতে পুলিশ সদস্যরা কাঁদানে গ্যাস ছুড়লে তাদের লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুড়ে আন্দোলনকারীরা। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশের অবস্থান দেখা যায় বাংলা একাডেমির সামনে, আর শিক্ষার্থীরা রয়েছেন টিএসসি মোড়ে।
সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা সংস্কারের দাবি ও ঢাবিতে আন্দোলনকারীদের উপর হামলার প্রতিবাদে পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজার মোড় অবরোধ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরা। ফলে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে পুরান ঢাকা।
আজ সোমবার বেলা ১২টার দিকে জবি থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে রায় সাহেব বাজারে অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা। দুপুর আড়াইটার দিকে তারা নয়াবাজার এলাকা দিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
রায় সাহেব বাজারে ছাত্রদের এমন অবস্থান নেওয়ায় সদরঘাট, ধোলাইখাল, ইসলামপুর ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন রুটের প্রায় কয়েকশ’ যানবাহন রাস্তায় আটকা পড়েছে। ফলে তীব্র যানজটে ভোগান্তিতে পড়েছেন এ এলাকার সড়ক ব্যবহারকারীরা।
তবে শিক্ষার্থীদের অবরোধ পরিস্থিতি ঠিক কখন নাগাদ শেষ হবে বা কারা এই অবস্থান কর্মসূচি পরিচালনা করছেন সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানা যায়নি।
একই প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরা। আজ সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে শতাধিক শিক্ষার্থী পুরান ঢাকার রাই সাহেব বাজার মোড়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন।
এছাড়া কোটা সংস্কারের দাবি ও বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে ক্লাস বর্জন করে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আজ সোমবার সকাল পৌনে ১০টায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী থেকে মিছিল নিয়ে গিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এসময় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
এর আগে তারা রাত ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত দফায় দফায় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে তারা।
এদিকে ক্লাস বর্জন করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি নগরীর ষোলশহর এলাকায় জড়ো হয়ে ট্রেন অবরোধ করে বিক্ষোভও করেন শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ষোলশহর রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জাকির হোসেন।
সকালে বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে চারটি ট্রেন ছেড়ে গেলেও তাতে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অন্যান্য দিনের তুলনায় কম ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থী শূন্য শ্রেনীকক্ষও। কেউ কেউ ক্লাস করতে এলেও, সহপাঠীদের অনুরোধে তারাও ক্লাস বর্জন করছেন। তবে ক্লাস বর্জন হলেও বিভিন্ন বিভাগের পূর্ব নির্ধারিত পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থীরা আজকের পূর্ব নির্ধারিত পরীক্ষাও বর্জন করছেন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস বর্জন করেছেন শিক্ষার্থীরা। কোটা সংস্কারের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অন্দোলনকারীরা অনির্দিষ্টকালেরর জন্য ক্লাস বর্জন করারও ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ পরিদর্শন করে দেখা যায়, অ্যাকাউন্টিং, ম্যানেজমেন্ট, গণিত, আইসিটিসহ বেশ কয়েকটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে ক্যাম্পাসে অবস্থান করেছেন পরবর্তী কর্মসূচির জন্য। অনেক বিভাগে মিডটার্ম পরীক্ষাও বর্জন করেছেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
কোটা সংস্কারসহ পাঁচ দফা দাবিতে সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও (ইবি) ক্লাস বর্জন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আজ সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আন্দোলনকারীরা মীর মশাররফ হোসেন একাডেমিক ভবন থেকে মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রধান সড়কে উঠতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি বাধা দেয়। এ সময় তারা মিছিল নিয়ে আবারও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অনুষদ প্রদক্ষিণ করতে থাকেন।
অপরদিকে চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা জানিয়ে এবং ঢাকায় বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদে দিনব্যাপী ছাত্র ধর্মঘট ডেকেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের বাধা দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া শিক্ষার্থীরা দুপুরে মানববন্ধন করার অনুমতি চাইলেও প্রক্টর জহির উদ্দিন আহমেদ তা দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। তবে এ বিষয়ে জানতে প্রক্টরকে ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এছাড়া ফের ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা। আজ সোমবার সকাল ১০টায় তারা সড়ক অবরোধ করে সেখানে অবস্থান নেন। কোনো বিভাগে ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়নি বলে জানা গেছে। এর আগে গতকাল রবিবার বিকেল ৪টা থেকে সাড়ে ৮টা এবং রাত দেড় টায় দুই দফায় মহসড়ক অবরোধ করেন রাবির বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
এদিকে একই দাবিতে সারা দেশে চলমান আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) শিক্ষার্থীরাও সকাল থেকে ক্লাস বর্জন করেছেন। আজ সোমবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চত্বরে জমা হতে থাকেন তারা। এ সময় বিভিন্ন প্লের্কাড ও ফেস্টুন হাতে তারা কোটা সংস্কারের পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) অ্যাকাডেমিক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছেন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা। আজ সোমবার সকাল ৮টা থেকে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আয়োজনে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের এ অবস্থান কর্মসূচি চলছে।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ও ঢাকার শাহবাগে আন্দোলনকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের প্রতিবাদে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
এছাড়া একই দাবিতে আজ সোমবার দুপুর দেড়টায় ক্যাম্পাস থেকে মিছিল বের করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়ক প্রায় আধাঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। এসময় মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে খুবির হাদিচত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন তারা।
এছাড়া বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের খুলনা জেলা শাখার উদ্যোগে বিকেল ৪টায় খুবির সামনে থেকে জিরোপয়েন্ট পর্যন্ত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
এই দাবিতে পটুয়াখালী-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সকাল থেকে এ অবরোধের কারণে বরিশাল থেকে বরগুনা, পটুয়াখালী ও ভোলায় সড়কপথে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জহিরুল ইসলাম ও আলামিন বলেন, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে রোববার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা একঘণ্টা সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে ফিরে যান। কিন্তু মধ্যরাতে ঢাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর ‘পুলিশি হামলায়’ হতাহতের ঘটনাসহ নানান খবরে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা আবারও রাস্তায় নেমে এসেছেন।
ঢেউ ক্যাম্পাসে আন্দোলনের 2018-04-09