এমএনএ অর্থনীতি ডেস্ক : দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শাহজালাল যেন স্বর্ণের খনিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনিই বৈধভাবে আসছে মণকে মণ স্বর্ণ। সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, দুবাই, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ যেসব দেশে বাংলাদেশের চেয়ে স্বর্ণের দাম কম সেসব দেশ হতে আসা যাত্রীরা নিয়ে আসছেন এ স্বর্ণ। আর এসব স্বর্ণের শুল্ক দিতে গিয়ে যাত্রীদের ভিড়ে মাছবাজারের মতো পরিস্থিতি হয় বিমানবন্দরে। প্রতিদিন গড়ে ৬ শতাধিক যাত্রী শুল্ক দিয়ে স্বর্ণ নিয়ে যান।
তবে সিংহভাগ স্বর্ণের মালিক যাত্রী নিজে নন, তারা বাহক মাত্র। বিদেশ থেকে আসা যাত্রীরা অর্থের বিনিময়ে চোরাচালান চক্র বা জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের স্বর্ণ বহন করে নির্দিষ্ট গন্তব্য বা ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেন মাত্র। এভাবে স্বর্ণ বহন ওপেন সিক্রেট। শাহজালাল বিমানবন্দর ও ঢাকা কাস্টমস সূত্র এবং যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সদ্য দুবাই থেকে আগত মনির (ছদ্মনাম) জানান, দুবাই এয়ারপোর্টে কয়েকজনকে দেখেছি তারা বাংলাদেশিদের স্বর্ণের বার নিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করছিলেন। সেজন্য টাকাও অফার করছিলেন। যেহেতু আইনে কোনো বাধা নেই তাই আমিও ২টি স্বর্ণের বার নিয়ে আসি। বিমানবন্দরে স্বর্ণের ট্যাক্সের টাকাও তারা দিয়ে দেন। তাদের লোক বিমানবন্দরের বাইরে স্বর্ণের বার ২টি নিয়ে যায়। বিনিময়ে ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এভাবেই যাত্রীরা হয়ে যাচ্ছেন বৈধ স্বর্ণের অবৈধ বাহক।
ঢাকা কাস্টমসের এক কর্মকর্তা সময়ের আলোকে বলেন, ব্যাগেজ রুলস অনুযায়ী, শুধু বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী একজন যাত্রী বিদেশ থেকে ১০০ গ্রাম ওজনের স্বর্ণ বা রুপার অলঙ্কার (এক রকম অলঙ্কার সর্বোচ্চ ১২টি) শুল্ক ও কর ছাড়াই আনতে পারবেন। বেশি হলে তা বাজেয়াপ্ত করা হয়। অন্যদিকে একজন যাত্রী ২৩৪ গ্রাম ওজনের ২টি সোনার বার বা পিণ্ড, রুপার বার বা পিণ্ড শুল্ক ও কর দিয়ে নিয়ে আসতে পারবেন। এ জন্য ব্যাগেজ রুলের আওতায় প্রতি ভরিতে (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) শুল্ক কর দিতে হবে ২ হাজার টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আপাতদৃষ্টিতে মালিক না হয়েও কারও পক্ষে এভাবে স্বর্ণ বহন অবৈধ মনে হলেও আইনে কোনো বাধা নেই। বেশিরভাগ যাত্রীর পক্ষেই নিজের টাকা দিয়ে ২টি সোনার বার কিনে নিয়ে আসা সম্ভব নয়। কিন্তু বার ২টি বহন করলেই অনেক টাকা পান। এ জন্য যাত্রী এই সুযোগটা নিচ্ছেন। ব্যাগেজ রুলসের আওতায় বৈধভাবে শুল্ক দিয়ে একটি সোনার বার আনলে প্রায় লাখ টাকা লাভ হয়। এই সুযোগ নিচ্ছে স্বর্ণের ব্যবসায়ীরা। তারা বিদেশের বিমানবন্দরে সোনা নিয়ে অপেক্ষা করেন। দেশে আসা যাত্রীদের অর্থের প্রলোভন দেয় এই বলে যে, আপনার কোনো অসুবিধা হবে না। আপনি বৈধভাবে ২টি সোনার বার নিয়ে যেতে পারবেন। এ জন্য আপনাকে দেওয়া হবে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং শুল্কের টাকাও দিয়ে দেওয়া হবে। আপনার শুধু কিছু সময় ব্যয় হবে। এয়ারপোর্টে বা বাইরে আমাদের লোক আছে, সে আপনাকে ফোন দিয়ে সোনার বার নিয়ে নেবে। আপনি শুধু বহন করবেন।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, ব্যাগেজ রুলসের আওতায় বৈধভাবে প্রায় প্রতিটি যাত্রীই সোনার বার বা অলঙ্কার নিয়ে আসেন। ২০২০ সালের নভেম্বর মাস থেকে ২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১২ মাসে যাত্রীদের বৈধভাবে নিয়ে আসা স্বর্ণে শুল্ক আদায় হয়েছে ৩৯৮ কোটি ৪৭ লাখ ৪৫ হাজার ৬১৪ টাকা। করোনা পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হওয়ায় বিমান চলাচল বেড়েছে। গত ৩ মাসে বৈধভাবে শুল্ক দিয়ে সোনার বার আনার পরিমাণও বেড়েছে।
শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ যেসব দেশ থেকে স্বর্ণ আনা যায়, সেসব দেশের ফ্লাইট এলেই বিমানবন্দরে শুল্ক ডেস্কের সামনে মাছবাজারের মতো অবস্থা হয়। প্রায় প্রত্যেক যাত্রীই ২টি করে স্বর্ণের বার নিয়ে আসেন। সরকার নির্ধারিত শুল্ক দিয়ে তা নিয়ে যান। সরকার প্রবাসীদের সুবিধার জন্য ব্যাগেজ রুলস করেছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে এর ব্যাপক অপব্যবহার হচ্ছে।
এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জিয়াউল হক সময়ের আলোকে জানান, ব্যাগেজ রুলসের এই সুযোগটা নিচ্ছে স্বর্ণ চোরাচালান চক্র। আমরা এমন বেশ কয়েকজন যাত্রীর কাছ থেকে জানতে পেরেছি, তারা স্বীকার করেছেন যে বৈধভাবে আনা এই স্বর্ণ তাদের না। যাত্রী টাকার প্রলোভনে পড়ে স্বর্ণ বহনে রাজি হন। আইনে কোনো বাধা না থাকায় ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
