এমএনএ প্রতিবেদক
বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিসহ দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে নিযুক্ত আগের প্রশাসকদের সরিয়ে নতুন পূর্ণকালীন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। যাঁরা এই পদগুলোতে নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁরা সবাই বিএনপির নেতা।
ছয় প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ (সিটি করপোরেশন-১ শাখা)।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ছয় সিটি করপোরেশনে যে ছয় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা হলেন— ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন: মো. আব্দুস সালাম; ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন: মো. শফিকুল ইসলাম খান (মিল্টন); খুলনা সিটি করপোরেশন: নজরুল ইসলাম মঞ্জু; সিলেট সিটি করপোরেশন: আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী; নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন: মো. সাখাওয়াত হোসেন খান; গাজীপুর সিটি করপোরেশন: মো. শওকত হোসেন সরকার।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৪–এর ধারা ২৫ক–এর উপধারা (১)–এর অনুবৃত্তিক্রমে এই ছয়জনকে করপোরেশন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত বা পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, নিয়োগকৃত প্রশাসকেরা স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৪–এর ধারা ২৫ক–এর উপধারা (৩) অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের মেয়রের ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁরা বিধি মোতাবেক ভাতা প্রাপ্য হবেন। জনস্বার্থে জারিকৃত এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘যত দ্রুত সম্ভব’ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলেছিলেন।
২০২৪ সালে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েই সিটি করপোরেশনগুলোর মেয়রদের পদচ্যুত করেছিল। এরপর নিয়োগ দেওয়া হয় ‘রাজনৈতিক’ প্রশাসক। বিএনপি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পর এখন ‘রাজনৈতিক’ প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলো।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নতুন প্রশাসক হয়েছেন আবদুস সালাম। বিএনপির বর্ষীয়ান এই নেতা একসময় অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র ছিলেন।
ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব ছিলেন আবদুস সালাম। পরে ঢাকা মহানগর বিএনপি উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত হয়ে যায়। আবদুস সালাম এখন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি। আবদুস সালাম বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন।
২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হলেও আবদুস সালাম এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হননি। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে দলীয় প্রার্থী বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিএসসিসির মেয়র ছিলেন শেখ ফজলে নূর তাপস। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের দুই দিন আগে দেশ ছেড়ে যান তিনি। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি শাহজাহান মিয়াকে ডিএসসিসির প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রশাসকেরও দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
গত বছরের অক্টোবরের শেষের দিকে ডিএসসিসির প্রশাসকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় শাহজাহান মিয়াকে। গত নভেম্বরে এ পদে নিয়োগ পান মো. মাহমুদুল হাসান। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা, পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও পরিদর্শন অনুবিভাগের মহাপরিচালক মাহমুদুল হাসানকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ডিএসসিসির প্রশাসক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এখন তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলেন আবদুস সালাম।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নতুন প্রশাসক হয়েছেন শফিকুল ইসলাম খান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তিনি। রাজধানীর শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কাফরুল ও মিরপুরের একাংশ নিয়ে গঠিত এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের কাছে হারেন তিনি।
শফিকুল ইসলাম খান যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্যসচিব ছিলেন। তিনি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিএনসিসির মেয়র ছিলেন আতিকুল ইসলাম। ২০১৯ সালে তিনি এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে আছেন তিনি।তিনি জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের কাছে নির্বাচনে হেরে যান।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসির প্রশাসক হিসেবে মোহাম্মদ এজাজকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। মেয়াদ পূর্তির পর এ মাসের শুরুর দিকে সুরাইয়া আখতার জাহানকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব। নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে ডিএনসিসির প্রশাসক হিসেবে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এখন এ পদে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলেন শফিকুল ইসলাম খান।
শওকত হোসেন সরকার গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি।
২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশন গঠিত হয়। এর আগে টানা ১০ বছর শওকত হোসেন সরকার কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। একই ইউনিয়ন পরিষদে তাঁর বাবা গিয়াসউদ্দিন সরকার, চাচা সোহরাব উদ্দিন সরকার এবং দাদা জবেদ আলী সরকারও চেয়ারম্যান ছিলেন।
আওয়ামী লীগ আমলে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ছিলেন শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। এখন তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলেন শওকত হোসেন সরকার।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক পদে নিয়োগ পেয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি।
আলোচিত সাত খুনের মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া সাখাওয়াত হোসেন খান নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন। ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপিদলীয় প্রার্থী ছিলেন তিনি। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগদলীয় প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী ৭৮ হাজার ৯৬৭ ভোটের ব্যবধানে তাঁকে পরাজিত করেন।
অন্তর্বর্তী সরকার আমলে পদচ্যুত সেলিনা হায়াৎ আইভী গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে রয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক পদে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব দিয়েছিল আবু নছর মোহাম্মদ আবদুল্লাহকে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলেন সাখাওয়াত হোসেন খান।
সিলেট সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক হলেন আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক দপ্তর সম্পাদক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব ছিলেন।
আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ২০২২ সালের ২৯ মার্চ সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ১২ মার্চ পর্যন্ত সিলেটে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের সমন্বয়কারী ও সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্বে ছিলেন।
বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক ছিলেন। তিনি বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য।
আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে মনোনয়ন পাননি। এ আসনে দলের মনোনয়ন পান যুক্তরাজ্য বিএনপির সদ্য সাবেক সভাপতি এম এ মালিক। নির্বাচনে আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী সিলেট জেলার সব কটি সংসদীয় আসনে বিএনপির প্রার্থীদের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক খান মো. রেজা-উন-নবীর স্থলাভিষিক্ত হলেন আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী।
বর্ষীয়ান রাজনীতিক নজরুল ইসলাম মঞ্জু খুলনা সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক পদে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক।
২০২১ সালের আগে দীর্ঘ ২৮ বছর খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এর মধ্যে ১৬ বছর সাধারণ সম্পাদক এবং ১২ বছর ছিলেন সভাপতি।
সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন। তবে এবার জিততে পারেননি। জামায়াতে ইসলামীর খুলনা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক শেখ জাহাঙ্গীর হোসেন হেলালের কাছে হারেন তিনি।
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জোটের ভরাডুবির মধ্যেও খুলনা-২ আসনে জয় পেয়েছিলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও নজরুল ইসলাম মঞ্জু খুলনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। একই বছরের খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী ছিলেন তিনি। এ দুই নির্বাচনে তিনি হেরে যান।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোখতার আহমেদের স্থলাভিষিক্ত হলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

