বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একসময় দেশের অন্যতম প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত বেনজীর আহমেদ বর্তমানে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার, পাসপোর্ট জালিয়াতি এবং মানবতাবিরোধী অপরাধসহ একাধিক মামলার আসামি।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, ইন্টারপোলের সহায়তায় গত ১২ জুন দুবাই পুলিশ তাকে আটক করে। পরবর্তীতে ইউএইর ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) বাংলাদেশকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করে। বর্তমানে তিনি দুবাইয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন।
রোববার জাতীয় সংসদে এক বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ তার গ্রেফতারের বিষয়টি জানান এবং বলেন, তাকে ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তৎপরতা চলছে।
১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন বেনজীর আহমেদ। কর্মজীবনে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং সর্বশেষ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার বিরুদ্ধে নানা গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—মানবতাবিরোধী অপরাধ; বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা; গুমের অভিযোগ; দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জন; জমি দখল; অর্থপাচার; পাসপোর্ট জালিয়াতি; এবং ভুয়া বা প্রশ্নবিদ্ধ পিএইচডি ডিগ্রি গ্রহণ। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া একাধিক মামলায় বেনজীর আহমেদ আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে সংঘটিত অভিযানে নিহতদের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় তিনি অন্যতম আসামি। সে সময় তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার ছিলেন। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন সূত্র অনুযায়ী, ওই ঘটনায় দেশের বিভিন্ন জেলায় মোট ৫৮ জন নিহত হওয়ার তথ্য আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এছাড়া র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলাতেও তিনি অভিযুক্ত। মামলাটিতে মোট ১৭ জন আসামি রয়েছেন এবং বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে প্রায় ৭৪ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠে এসেছে।
দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী— বেনজীর আহমেদের নামে প্রায় ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ শনাক্ত হয়েছে। প্রায় ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে। তার স্ত্রী জীশান মীর্জার নামে প্রায় ৩১ কোটি ৬২ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। বড় মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীরের নামে প্রায় ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। মেজ মেয়ে তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীরের নামে প্রায় ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তে গুলশান এলাকায় চারটি ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব, ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার, তিনটি বিও হিসাব এবং প্রায় ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। আদালতের নির্দেশে এসব সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
দুদকের আরেক মামলায় বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে প্রায় ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা অর্থপাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ঋণের অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করা হয়েছে তার কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিবিএ) প্রোগ্রাম থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ‘ড. বেনজীর আহমেদ’ পরিচয় ব্যবহার শুরু করেন। পরে অভিযোগ ওঠে যে তিনি ভর্তির ন্যূনতম যোগ্যতা পূরণ না করেই ওই প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েছিলেন। তদন্তের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার ডিগ্রি স্থগিত করে।
এছাড়া ২০১৬ সালে র্যাব প্রধান থাকাকালে সরকারি কর্মকর্তা হয়েও নিজেকে বেসরকারি চাকরিজীবী হিসেবে দেখিয়ে পাসপোর্ট নবায়নের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় প্রশাসনের অভ্যন্তরে প্রশ্ন সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে দ্রুত পাসপোর্ট প্রদান করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সেই তালিকায় বেনজীর আহমেদের নামও ছিল। যদিও তখন তিনি র্যাবে না থেকে আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ মে বেনজীর আহমেদ স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন।পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলায় ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিকভাবে তাকে পলাতক আসামি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বাংলাদেশ পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইন্টারপোলের তথ্যের ভিত্তিতে দুবাই পুলিশ তাকে শনাক্ত করে এবং গত ১২ জুন গ্রেফতার করে। এরপর বিষয়টি বাংলাদেশকে জানানো হয়।
দেশে ফিরিয়ে আনা কি সম্ভব?
বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে ২০১৪ সালে অপরাধী প্রত্যর্পণ এবং দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি স্থানান্তর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।এই চুক্তির আওতায় কোনো ব্যক্তি এক দেশে অপরাধ করে অন্য দেশে পালিয়ে গেলে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে ফেরত চাওয়া যায়। তবে চুক্তি থাকলেও প্রত্যর্পণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয় না; সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত এবং সরকারকে আইনি যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করতে হয়।
বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সাধারণত নিম্নোক্ত ধাপগুলো অনুসরণ করা হবে— ১. বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন। ২. ইউএই কর্তৃপক্ষের নথিপত্র যাচাই। ৩. আদালতের মাধ্যমে অভিযোগের আইনি মূল্যায়ন। ৪. বেনজীর আহমেদের আপত্তি বা আপিলের সুযোগ। ৫. আদালতের অনুমোদনের পর চূড়ান্ত হস্তান্তর।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পরিস্থিতি অনুযায়ী সময় ভিন্ন হতে পারে। দ্রুততম পরিস্থিতি: ৩ থেকে ৬ মাস। স্বাভাবিক পরিস্থিতি: ৬ থেকে ১২ মাস। জটিল পরিস্থিতি: ১ থেকে ২ বছর বা তারও বেশি।
যদি বেনজীর আহমেদ ইউএই আদালতে প্রত্যর্পণের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করেন, তাহলে পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে।
বাংলাদেশ অতীতে ইন্টারপোলের সহায়তায় একাধিক পলাতক আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— নূর হোসেন (নারায়ণগঞ্জ সাত খুন মামলা), যাকে ভারত থেকে প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে দেশে আনা হয়েছিল।
তবে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের মূল হোতা পি কে হালদার, যিনি ভারতে গ্রেফতার হলেও সেখানকার বিচারিক প্রক্রিয়ার কারণে এখনো বাংলাদেশে প্রত্যর্পিত হননি।
বিভিন্ন সময় যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইউএই থেকেও একাধিক আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
সরকার ও দুদক জানিয়েছে, বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও আইনি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে চূড়ান্ত প্রত্যর্পণ সম্পূর্ণরূপে ইউএইর আদালতের সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।
একসময় দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে থাকা বেনজীর আহমেদের গ্রেফতার বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত আইনগত ও রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন নজর থাকবে—তিনি কত দ্রুত দেশে ফেরেন এবং তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর বিচারিক পরিণতি কী হয়।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
