এমএনএ রিপোর্ট : বগুড়ায় বাড়ি থেকে ক্যাডার দিয়ে তুলে নিয়ে ছাত্রীকে ধর্ষণ এবং মাসহ তাকে ন্যাড়া করার মামলায় শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক তুফানসহ তিনজনের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
আজ রবিবার বগুড়ার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম শ্যাম সুন্দর রায়ের আদালতে আসামিদের হাজির করে সাত দিন করে রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত শুনানি শেষে প্রত্যেকের তিনদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করে।
রিমান্ড মঞ্জুর হওয়া অন্য দুই আসামি হলেন তুফানের সহযোগী শহরের চকসূত্রাপুর কসাইপট্টির আলী আজম ওরফে দিপু এবং কালীতলা এলাকার রূপম হোসেন।
বগুড়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তী জানান, গ্রেপ্তার ৪ জনের মধ্যে আসামি আতিকুর রহমান ইতোমধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। পাশাপাশি এই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। তাই তাকে বাদ দিয়ে বাকি ৩ আসামির রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। আতিক গতকাল শনিবার রাতে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল মামুনের আদালতে ঘটনা স্বীকার করেছে।
ধর্ষণের শিকার মেয়েটি এখনো অসুস্থ। মাসহ তিনি এখন বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান আবদুল মোত্তালেব হোসেন বলেন, মেয়েটির শরীরে লোহা বা রড–জাতীয় বস্তু দিয়ে সাত থেকে আট জায়গায় আঘাত করা হয়েছে। ফোলা ও জখম আছে। তবে তিনি শঙ্কামুক্ত।
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তী জানান, নতুন কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। নির্যাতনকারী নারী কাউন্সিলর ও অন্যদের ধরার চেষ্টা চলছে। তিনি আরও জানান, তুফান সরকারের বিরুদ্ধে মাদকের দুটি মামলা রয়েছে। এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে যুবদল নেতা ইমরান হত্যা মামলা ছিল। মেয়েটির ধর্ষণের ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য আজ আবেদন করা হবে।
এ দিকে এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান বগুড়ার জেলা প্রশাসক নূরে আরম সিদ্দীকী। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুস সামাদকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক নূরে আলম সিদ্দিকী বেলা ১১টার দিকে বগুড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ধর্ষণের শিকার ছাত্রী ও তার মাকে দেখতে যান। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিনি মেয়েটিকে চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেন। মেয়েটির ফলাফলের ভিত্তিতে তাঁর কলেজে ভর্তির ব্যবস্থাও করবেন বলে জানান। তিনি আরও জানান, এ ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবদুস সামাদ প্রধানের নেতৃত্বে কমিটিতে আছেন, জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক শহীদুল ইসলাম খান ও জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম।
ঘটনার বিবরণ সম্পর্কে পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ভালো কলেজে ভর্তির প্রলোভন দেখিয়ে ভর্তি-ইচ্ছুক ছাত্রীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেন বগুড়ার শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক তুফান সরকার। বিষয়টি ধামাচাপা দিতে ঘটনার ১০ দিন পর গত শুক্রবার দুপুরে তুফান সরকার, তাঁর স্ত্রী আশা, ঐ ঘটনার সহযোগী দলীয় ক্যাডাররা ও তার বড় বোন বগুড়া পৌরসভার সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর মার্জিয়া হাসান রুমকির নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন ধর্ষিত কিশোরী এবং তার মাকে বাড়ি থেকে তুলে নেয়। পরে শহরের চকসূত্রাপুর
এলাকায় কাউন্সিলর রুমকির বাড়িতে নিয়ে চার ঘণ্টা ধরে তাঁরা ছাত্রী ও তার মায়ের ওপর নির্যাতন চালান। এরপর দুজনেরই মাথা ন্যাড়া করে দেয়া হয়।
প্রায় ৪ ঘণ্টা ধরে নির্যাতনের পর আশা ও তার বোন রুমকি তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার সময় হুমকি দিয়ে বলেন, ‘২০ মিনিটের মধ্যে বগুড়া শহর ছেড়ে যাবি। অন্যথায় তোদের আরও খারাপ পরিণতি ভোগ করতে হবে’।
পরে রাত পৌনে ১০টার দিকে ওই কিশোরী ও তার মাকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনায় কিশোরীর মা বাদী হয়ে গত শুক্রবার রাতে শ্রমিক লীগ নেতা তুফান সরকার, তাঁর স্ত্রী আশা সরকার, আশা সরকারের বড় বোন বগুড়া পৌরসভার সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর মার্জিয়া আক্তারসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগে দুটি মামলা করেছেন।
জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম জানান, এ ঘটনা খুবই জঘন্যতম। কাউকে মুখ দেখানো যাচ্ছে না। দলীয়ভাবে তিনি লজ্জিত বলে জানান। বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক তুফান সরকারের ব্যাপারে তিনি আরও বলেন, এমন কোনো অপকর্ম নেই যে এই নেতা করেন না। তাঁর অভিযোগ, শ্রমিক লীগের এক নেতার ছত্রচ্ছায়ায় আছেন তুফান। হাইকমান্ড তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলে সঙ্গে সঙ্গে পালন করা হবে।
এদিকে ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদে বেলা তিনটার দিকে শহরের সাতমাথায় সচেতন নাগরিক সমাজের ব্যানারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সমাজের সর্বস্তরের লোকজন অংশ নেন।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

