এমএনএ প্রতিবেদক
টানা ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে দেশের হাওরাঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ পরিস্থিতি। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ হাওরে পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান। একমাত্র ফসল হারানোর শঙ্কায় কৃষকদের মাঝে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তা।
হাওরাঞ্চলের কৃষি ও জীবিকা সম্পূর্ণ নির্ভর করে বোরো ধানের ওপর। এই একমাত্র ফসল ঘরে তুলতে পারলেই সারা বছরের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। তবে চলতি মৌসুমে প্রকৃতির বিরূপ আচরণে সেই স্বপ্ন ভেঙে পড়ছে কৃষকের চোখের সামনে।
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে সরেজমিনে দেখা গেছে, যেখানে এই সময়ে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর উৎসব থাকার কথা, সেখানে বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা। শিয়ালমারা ও করচার হাওরে অধিকাংশ জমি পানির নিচে।
শিয়ালমারা হাওরের কৃষক আমজদ আলী জানান, ১২ কেয়ার জমিতে চাষ করা তার পুরো ধান এক রাতের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “আমার সব শেষ। একটা ধানও ঘরে তুলতে পারিনি। এখন পরিবার চালাবো কীভাবে, ঋণ শোধ করবো কীভাবে—কিছুই বুঝতে পারছি না।”
একই চিত্র গোটা হাওরজুড়ে। কেউ ধান হারিয়ে কাঁদছেন, কেউবা অবশিষ্ট ধান বাঁচাতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।
কৃষক আবুল মিয়া বলেন, “হাওরে যদি পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে হয়তো এই ক্ষতি হতো না।”
ধান কাটার সময় সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রমিকের অভাব। বজ্রপাতের আশঙ্কায় অনেক শ্রমিক হাওরে কাজ করতে আসছেন না।
শনির হাওরের কৃষক কবির মিয়া বলেন, “বজ্রপাতের ভয় আর পানি বাড়ার কারণে শ্রমিকরা আসছে না। তাই নিজেরাই ধান কাটার চেষ্টা করছি।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সুনামগঞ্জে এ বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।তবে সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে অন্তত ৭ হাজার হেক্টর জমি জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৩ হাজার হেক্টরের ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার ১.৫১ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও ক্রমাগত বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার সতর্ক করে বলেন, “আগামী কয়েকদিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে এবং পাহাড়ি ঢল নামলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।”
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম হাওরে গত কয়েকদিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিয়েছে। নিকলী আবহাওয়া অফিস জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।
কৃষক ফুল মিয়া বলেন, “১০ একর জমির ধান কাটার সময় ছিল। এখন সব পানির নিচে। বুকসমান পানিতে নেমেও কিছু বাঁচাতে পারিনি।”
কামরুল ইসলাম নামের আরেক কৃষক জানান, তার দেড় একর জমির অধিকাংশ ধান তলিয়ে গেছে। “আধাপাকা ধান কেটে নিচ্ছি, কিন্তু তা বিক্রির উপযোগী না। ঋণ কীভাবে শোধ করবো বুঝতে পারছি না।”
মৌলভীবাজারে ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে, যার মধ্যে ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর হাওর এলাকায়।
হাওর এলাকায় প্রায় ৮৩ শতাংশ ধান কাটা হলেও নন-হাওর এলাকায় মাত্র ১৭ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। ফলে ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।
কমলগঞ্জের কৃষক কামাল আহমেদ বলেন, “এক একর জমির ধান চোখের সামনে ডুবে গেলো। এখন পরিবার চালানোই কঠিন।”
কৃষি কর্মকর্তারা দ্রুত ধান কাটার ওপর জোর দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশের পরিবর্তে ৫০ শতাংশ পাকা ধানও কাটতে বলা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি বিভাগের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, বাইরে থেকে শ্রমিক আনার চেষ্টা চলছে এবং কৃষকদের উঁচু স্থানে ধান সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রধান দাবিগুলো হলো— জরুরি আর্থিক প্রণোদনা; কৃষিঋণ পুনঃতফসিল; স্থায়ী হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও দ্রুত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা।
কৃষক বেলাল ভূঁইয়া বলেন, “স্থায়ী বাঁধ না হলে প্রতিবছরই আমরা এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবো।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত বৃষ্টি ও আকস্মিক ঢলের প্রবণতা বাড়ছে, যা হাওরাঞ্চলের কৃষিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই অঞ্চলের কৃষি টেকসই রাখা কঠিন হবে।
বর্তমানে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের চোখ আকাশের দিকে। তাদের একটাই প্রত্যাশা—বৃষ্টি থামুক, উঠুক রোদ। যেন শেষ সম্বলটুকু অন্তত ঘরে তুলতে পারেন তারা।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

