এমএনএ অর্থনীতি ডেস্ক : করোনার মধ্যেও চমক দেখাচ্ছে রফতানি পণ্যগুলো। চলতি অর্থবছরের ৭ মাসেই (জুলাই-জানুয়ারি) ২ হাজার ৯৫৪ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করেছেন রফতানিকারকরা, যেখানে পুরো অর্থবছরে রফতানির টার্গেট ছিল ৪ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার। এই সময়ে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) বুধবার রফতানি আয়ের হালনাগাদ এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
এদিকে নতুন বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে বিভিন্ন পণ্য রফতানি করে ৪৮৫ কোটি ৩ লাখ ৭০ হাজার (৪.৮৫ বিলিয়ন) ডলার বিদেশি মুদ্রা দেশে এনেছেন রফতানিকারকরা। বর্তমান বিনিময় হার (৮৬ টাকা) টাকার অঙ্কে এই অর্থের পরিমাণ ৪১ হাজার ৭১৩ কোটি ১৮ লাখ ২০ হাজার টাকা। ২০২১ সালের জানুয়ারির তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪১ দশমিক ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ গত বছরের জানুয়ারির চেয়ে এই জানুয়ারিতে পণ্য রফতানি থেকে ৪১ দশমিক ১৩ শতাংশ বেশি বিদেশি মুদ্রা দেশে এসেছে। লক্ষ্যের চেয়ে আয় বেশি এসেছে প্রায় ২০ শতাংশ। একক মাসের হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এই আয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ; আগের মাস ডিসেম্বরে একটু বেশি ৪৯০ কোটি ৭৭ লাখ (৪.৯০ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়েছিল।
শুধু তৈরি পোশাক নয়, প্রায় সব খাতের আশার আলো জাগিয়ে ২০২২ সাল শুরু হয়েছে। আর সব মিলিয়ে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের (জুলাই-জানুয়ারি) হিসাবে ২৯ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন (২ হাজার ৯৫৪ কোটি ৮৯ লাখ) ডলার রফতানি আয় দেশে এসেছে। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩০ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি।
রফতানি আয় প্রায় প্রতিবছরই বাড়ে। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারে কমই; কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। করোনার মধ্যেও দারুণ প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি যতটা লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি হারে আয় করছে দেশ।
জুলাই-জানুয়ারি সময়ে তৈরি পোশাক ছাড়াও কৃষি প্রক্রিয়াজাত, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশল পণ্য ও হস্তশিল্প রফতানি বেড়েছে। ফলে সামগ্রিক পণ্য রফতানিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি আয় কমেছে সাড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।
এই সাত মাসে মোট রফতানি আয়ের মধ্যে ২ হাজার ৩৯৮ কোটি ৫৩ লাখ (প্রায় ২৪ বিলিয়ন) ডলারই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই আয় গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩০ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেড়েছে ১৭ দশমিক ৭২ শতাংশ।
মোট রফতানি আয়ের মধ্যে ৮১ দশমিক ১৭ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক থেকে। এর মধ্যে নিট পোশাক থেকে এসেছে ১ হাজার ৩২৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। লক্ষ্যের চেয়ে বেশি এসেছে ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
ওভেন পোশাক থেকে এসেছে ১ হাজার ৭১ কোটি ১২ লাখ ডলার। আয় বেড়েছে ২৭ দশমিক ২৩ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেড়েছে ১৭ দশমিক ২১ শতাংশ।
এ ছাড়া জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ৭৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারের কৃষিপণ্য, ৮৩ কোটি ১৩ লাখ ডলারের হোম টেক্সটাইল, ৬৮ কোটি ২৭ লাখ ডলার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ৬৯ কোটি ৫৭ লাখ ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি হয়েছে। হিমায়িত মাছ রফতানি থেকে আয় হয়েছে ৩৭ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। ওষুধ রফতানি থেকে এসেছে ১১ কোটি ৭১ লাখ ডলার।
গত বছরের ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২১-২২ অর্থবছরে পণ্য রফতানি আয়ের মোট লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৪৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাত থেকে আয়ের লক্ষ্য ধরা আছে ৩৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে পণ্য রফতানি থেকে ৩৮ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার আয় করে বাংলাদেশ, যা ছিল আগের বছরের চেয়ে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩৬৭ কোটি (৩৩.৬৭ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রফতানি হয়, যা ছিল আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৭ শতাংশ কম।
রফতানিকারকরা বলছেন, ২০২২ সালজুড়েই রফতানি আয়ের এই উল্লম্ফন অব্যাহত থাকবে। রফতানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, সত্যিই আমরা খুশি। এত দ্রুত করোনা মহামারির ধাক্কা সামলে আমরা ঘুরে দাঁড়াব, ভাবতে পারিনি। করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন নিয়ে আমরা ভয় পেয়েছিলাম; কিন্তু এখন সে ভয় কেটে গেছে। করোনাকে সঙ্গে নিয়েই সব দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতে ফের লকডাউনের যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, সেটা নেই। নতুন বাজারেও রফতানি বাড়ছে। তাই সার্বিকভাবে বলা যায়, রফতানি আয়ের এই ইতিবাচক ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।
চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে পণ্য ও সেবা মিলিয়ে মোট ৫১ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্য ধরেছে সরকার। এর মধ্যে পণ্য রফতানি থেকে আয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৪৩ বিলিয়ন ডলার।
সার্বিক রফতানি পরিস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে আমাদের রফতানি ৫২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে, যা হবে একটি মাইলফলক। বাংলাদেশের ৫০ বছরের বড় অর্জন।’
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
