এমএনএ প্রতিবেদক
রাজধানী ঢাকায় ছিনতাইকারীদের বেপরোয়া তৎপরতার আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনায় প্রাণ হারালেন এক কর্মজীবী নারী। বাস থেকে নেমে একমাত্র মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রিকশায় করে বাসায় ফিরছিলেন ৪২ বছর বয়সী সোহেলি ইসলাম। কিন্তু পথেই মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারীর হামলার শিকার হন তিনি। ছিনতাইকারীর টানাহেঁচড়ায় চলন্ত রিকশা থেকে সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন সোহেলি। চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোহেলি ইসলাম দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার বাসিন্দা এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস-এ মেডিক্যাল সার্ভিস অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চাকরির সুবাদে তিনি ঢাকার ধানমন্ডির গ্রীন রোড সংলগ্ন একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন।
কয়েক দিন আগে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মেয়েকে নিয়ে নিজ এলাকায় গিয়েছিলেন তিনি। অনুষ্ঠান শেষে গত শনিবার রাত ৯টার বাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। রোববার ভোর প্রায় ৫টার দিকে গাবতলীতে পৌঁছে কিছু সময় বাস কাউন্টারে অপেক্ষা করেন। পরে সকাল সোয়া ৬টার দিকে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে একটি রিকশায় বাসার উদ্দেশে রওনা হন।
কিন্তু ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে পৌঁছালে ঘটে বিপর্যয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের সদস্যদের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি মোটরসাইকেলে করে মাথায় হেলমেট পরা দুই ব্যক্তি রিকশার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। মোটরসাইকেলের পেছনে বসা ব্যক্তি আচমকা সোহেলির হাতে প্যাঁচানো ভ্যানিটি ব্যাগটি জোরে টান দিতে শুরু করে।
ব্যাগ ছাড়তে না চাইলে শুরু হয় টানাহেঁচড়া। একপর্যায়ে ভারসাম্য হারিয়ে চলন্ত রিকশা থেকে সড়কে ছিটকে পড়েন সোহেলি ইসলাম।
পড়ে গিয়ে তাঁর ডান হাত ভেঙে যায় এবং মাথার পেছনের অংশে গুরুতর আঘাত লাগে। আঘাতের কারণে কান দিয়ে রক্ত বের হতে শুরু করে। ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে যে তাঁর সঙ্গে থাকা মেয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই মা রক্তাক্ত অবস্থায় সড়কে পড়ে যান।
সোহেলির ভগ্নিপতি তরিকুল ইসলাম জানান, দুর্ঘটনার পর তিনি মারাত্মক রক্তক্ষরণে ভুগছিলেন। আশপাশের মানুষের কাছে বারবার সাহায্য চাওয়া হলেও শুরুতে কেউ এগিয়ে আসেননি।
পরে রিকশাচালক এবং এক পথচারীর সহায়তায় তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রথমে ভর্তি করা হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে পরে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হসপিটাল-এ স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকেও উন্নত চিকিৎসার জন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ততক্ষণে তাঁর মস্তিষ্কে আঘাতের জটিলতা গুরুতর আকার ধারণ করে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, শেষ দিকে তিনি আর কথা বলতে পারছিলেন না; শুধু যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছিলেন।
চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও চার দিন ধরে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার পর বৃহস্পতিবার সকালে একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সোহেলি ইসলাম।
তাঁর মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছেন তাঁর একমাত্র মেয়ে, যিনি বর্তমানে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। মায়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন তিনি।
মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজনদের মধ্যে শোকের মাতম শুরু হয়। বৃহস্পতিবার বিকেলে পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার পশ্চিম টেংরী এলাকায়, যেখানে তাঁর নানাবাড়ি অবস্থিত, সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
পরিবার জানিয়েছে, ঘটনার ভয়াবহতা ও শোক সামলাতে ব্যস্ত থাকায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা করা হয়নি। তবে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনা রাজধানীতে ছিনতাই ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একটি ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা যে একটি পরিবারের একমাত্র অবলম্বনকে কেড়ে নিতে পারে, সোহেলি ইসলামের মৃত্যু সেই নির্মম বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
