Don't Miss
Home / অর্থনীতি / নতুন সরকারের প্রথম বাজেট পেশ বৃহস্পতিবার: অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট পেশ বৃহস্পতিবার: অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম জাতীয় বাজেট আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেট বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সংসদে উপস্থাপনের আগে প্রস্তাবিত বাজেট সংসদ ভবনের মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হবে। পরে সংসদে উপস্থাপনের অনুমোদনের জন্য খসড়া বাজেট রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে বলে সংসদ ও অর্থ বিভাগের সূত্র জানিয়েছে।

রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের হিসাবের বাইরে এবারের বাজেটকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার নীতিমালা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

“সবার আগে বাংলাদেশ” স্লোগানকে সামনে রেখে প্রস্তুত করা এই বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য একটি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।

২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য সামনে রেখেই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতির মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ছিল। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদরা আসন্ন বাজেটকে “অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বাজেট” হিসেবে অভিহিত করছেন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারের অর্থায়ন পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। মোট ঘাটতির মধ্যে বৈদেশিক ঋণ থেকে ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের পর নিট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা।

সরকার ইতোমধ্যে ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আসবে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সে অনুযায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, দেশের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি। তিনি বলেন, বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান হবে না এবং কর্মসংস্থান ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।

রাজস্ব আদায়ও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত অন্যতম কম। বিশ্বব্যাংকের সাবেক ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, নতুন কর আরোপের চেয়ে করের আওতা বাড়ানো এবং কর ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করা বেশি জরুরি।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কারও বাজেটের অন্যতম অগ্রাধিকার। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও তারল্য সংকট বিনিয়োগ আস্থাকে প্রভাবিত করছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আর্থিক খাতে জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করেই আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

সরকার সৃজনশীল অর্থনীতিকে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎস হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছে। চলচ্চিত্র, সংগীত, ডিজিটাল মিডিয়া, অ্যানিমেশন, গেমিং, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজাইন ও কনটেন্টভিত্তিক শিল্প খাতকে এর আওতায় আনা হচ্ছে।

এই খাতের উন্নয়নে প্রস্তাব করা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকার ক্রিয়েটিভ ইকোনমি প্ল্যাটফর্ম এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ২০০ কোটি টাকার তহবিল।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় পরিবার কার্ডের জন্য ১২ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা, কৃষক কার্ডের জন্য ১ হাজার ৬৩ কোটি টাকা এবং ব্লু ইকোনমি উন্নয়নে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের কারণে পরিচালন ব্যয় বাড়বে। এ খাতে অতিরিক্ত প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এবারের বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে। অবকাঠামোকেন্দ্রিক ব্যয়ের পরিবর্তে মানবসম্পদ উন্নয়নে সরকারের নীতিগত পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৯৭ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা বা জিডিপির ১ দশমিক ৬১ শতাংশ।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ১ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা।

স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ থেকে চিকিৎসাসেবা উন্নয়ন, ওষুধ ও টিকা সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং ১৪ জেলায় পরীক্ষামূলক ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারি শূন্য পদ দ্রুত পূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২১ লাখ প্রবাসী কার্ড ইস্যু এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

যুব ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিলের প্রস্তাব রয়েছে।

অবকাঠামো খাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ৩৫ হাজার ১৯০ কোটি টাকা, পরিবহন ও যোগাযোগে ৬১ হাজার ১৩২ কোটি টাকা এবং কৃষিতে ৪৩ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, এটি দুই দশক পর বিএনপির প্রথম বাজেট এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বাজেট। অভ্যন্তরীণ সংকট, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা সরকারের জন্য কঠিন হবে।

অর্থ বিভাগের নথি অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে ফিরে যাওয়া, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা।

জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের জন্য প্রথমবারের মতো মাসিক সম্মানী চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গুরুতর আহতদের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানীর সমপরিমাণ ভাতা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে।

সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, সেবায়েত, বিহার প্রধান ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সম্মানী, বেকার শ্রমিকদের সুরক্ষা কর্মসূচি, ভিজিএফ কর্মসূচির পুনর্গঠন, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে।

x

Check Also

নারী ও শিশু বিষয়ক মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানিতে হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠন

আদালত প্রতিবেদক নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে দায়ের হওয়া মামলার ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড ...