এমএনএ প্রতিবেদক
শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা আবার চালুর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, শ্রমিকেরা ভালো থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে। একইভাবে কৃষক ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ভালো থাকলে এ দেশ ভালো থাকবে।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। মে দিবস উপলক্ষে এই শ্রমিক সমাবেশের আয়োজন করে বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল।
বেলা আড়াইটায় সমাবেশের সময় নির্ধারিত থাকলেও দুপুর ১২টা থেকেই খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীরা নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আসতে থাকেন। তাঁদের বেশির ভাগের মাথায় ছিল লাল টুপি। কারও হাতে ছিল দলীয় পতাকা, কারও হাতে দেশের পতাকা। অনেকে আবার কৃষকের পোশাক পরেও সমাবেশে অংশ নেন। ঢাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডের শ্রমিক দলের নেতা-কর্মী-সমর্থক ছাড়াও গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ প্রভৃতি জেলার শিল্পকারখানার শ্রমিকেরা সমাবেশে অংশ নেন। কাকরাইল থেকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত হাজার হাজার নেতা-কর্মীর উপস্থিতিতে সমাবেশ জনসমুদ্রে রূপ নেয়।
সমাবেশে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে দেশের শিল্পকারখানাগুলো পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। অর্থনীতিকে করা হয়েছিল আমদানিনির্ভর। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে। বন্ধ কলকারখানাগুলো কত দ্রুত চালু করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে চলতি সপ্তাহেই একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। পর্যায়ক্রমিকভাবে দেশের সব বন্ধ কলকারখানা চালু করে বেকার হয়ে পড়া শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জানি শুধু বন্ধ কারখানা চালু করলে সবার কর্মসংস্থান হবে না। আরও লাখ লাখ বেকার যুবক রয়েছেন। তাঁদের জন্য দেশে ও দেশের বাইরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে আমরা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করছি। শ্রমিকদের ভাগ্য নিয়ে আর কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না।’
সমাবেশ মঞ্চে উপস্থিত হয়ে নেতা–কর্মীদের উদ্দেশে হাত নাড়েন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে
সমাবেশ মঞ্চে উপস্থিত হয়ে নেতা–কর্মীদের উদ্দেশে হাত নাড়েন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনেছবি: তানভীর আহাম্মেদ
ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে হকার উচ্ছেদ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হকারদেরও পরিবার আছে, তাঁদেরও খেয়ে-পরে বাঁচতে হবে। শুধু উচ্ছেদ করলেই হবে না, তাঁদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান বা ব্যবসার জায়গা নিশ্চিত করতে হবে। ইতিমধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ ও পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘বিগত এক যুগের বেশি সময় আমরা দেখেছি, কীভাবে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। শুধু শ্রমিক নয়—ছাত্র, শিক্ষক, নারী এবং এ দেশের প্রতিটি খেটে খাওয়া মানুষকে অধিকারহারা করা হয়েছিল।’
তারেক রহমান বলেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকার এ দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অধিকারও কেড়ে নিয়েছিল। গত এক দশকে পরিকল্পিতভাবে দেশের অর্থনীতিকে লুটপাটের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে এবং শিল্পকারখানাগুলো বন্ধ করে পুরো দেশকে আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়েছিল।
রাষ্ট্র সংস্কার ও ৩১ দফার বাস্তবায়ন
বিএনপি ‘রাষ্ট্র মেরামতে’র যে ৩১ দফা রূপরেখা দিয়েছিল, সরকার গঠনের পর দ্রুততার সঙ্গে তা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা আড়াই-তিন বছর আগেই এই ৩১ দফা জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিলাম। সেখানে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও নারীদের প্রতিটি শ্রেণির মানুষের কথা ছিল। কারণ, শ্রমিক-কৃষক বাঁচলেই এ দেশ বাঁচবে। আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ করার, আমরা তা করেছি। কৃষক কার্ড দেওয়ার কাজও শুরু হয়েছে।’
গ্রামের মানুষের পানির চাহিদা মেটাতে এবং কৃষি সেচব্যবস্থা উন্নত করতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সূচিত ‘খাল খনন’ কর্মসূচি আবার দেশব্যাপী শুরু করার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, আজ শনিবার থেকে দেশব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রতিভাবান খেলোয়াড় অন্বেষণ শুরু হবে। শ্রমিক বা কৃষক পরিবারের সন্তান যে-ই হোক, যারা খেলাধুলায় ভালো, তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।
মে দিবস উপলক্ষে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল আয়োজিত সমাবেশে উপস্থিত নেতা–কর্মীদের একাংশ। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে
মে দিবস উপলক্ষে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল আয়োজিত সমাবেশে উপস্থিত নেতা–কর্মীদের একাংশ। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনেছবি: প্রথম আলো
রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নিয়ে নেতা-কর্মীদের সতর্ক করেন তারেক রহমান। বলেন, বাংলাদেশ যখনই গণতন্ত্রের পথে হাঁটে, কিছু মহল তা পছন্দ করে না। অতীতে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যখন ‘ইমার্জিং টাইগার’ হয়েছিল, তখনো ষড়যন্ত্র হয়েছিল। ১২ তারিখের নির্বাচনের পর এখনো সেই মহল বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে বন্ধুহীন করার চেষ্টা করছে। তবে বর্তমান সরকারের পেছনে জনগণের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। বিশ্বদরবার এখন ষড়যন্ত্রকারীদের কথায় কান দিচ্ছে না।
শ্রমিকদের ‘ন্যূনতম মজুরি’ নির্ধারণের দাবি
সমাবেশে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে দেশকে আবার গড়ে তুলতে শ্রমিক শ্রেণিকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের কৃষি, শিল্প এবং ব্যাংক-বিমা খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে, সেখান থেকে দেশকে টেনে তুলতে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের কথা স্মরণ করে মির্জা ফখরুল বলেন, সেদিন পুলিশের অতর্কিত হামলায় প্রথম শহীদ হয়েছিলেন শ্রমিকনেতা মকবুল। ফ্যাসিস্টবিরোধী এই আন্দোলনে অসংখ্য শ্রমিক প্রাণ দিয়েছেন।
ন্যূনতম মজুরি ও চা-বাগানের শ্রমিকদের দুর্দশা, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, বর্তমান বাজারে শ্রমিকের টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। তিনি শ্রমিকদের জন্য একটি সম্মানজনক ‘ন্যূনতম মজুরি’ নির্ধারণের দাবি জানান। বিশেষ করে চা-বাগানের শ্রমিকদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চা-বাগানের শ্রমিকেরা অমানবিক জীবন যাপন করেন।
শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক মনজরুল ইসলামের সঞ্চালনায় সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমান উল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়কারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু, উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম, ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক শফিকুল আলম মিল্টন, ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আবদুস সালাম, যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম প্রমুখ বক্তব্য দেন।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

