পাবনা প্রতিনিধি
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। মঙ্গলবার পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এ আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হতে ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগবে। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আগামী আগস্টের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে প্রকল্প এলাকায় আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ সুইচ টিপে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন অতিথিরা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। স্বাগত বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। এছাড়া ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা-এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি। এর আগে প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, “নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশনা ছিল। আজ জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য বাস্তবে রূপ নিল।”
তিনি বলেন, “ফিজিক্যাল স্টার্টআপ থেকে জ্বালানি লোডিং পর্যন্ত এই অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। বহু বছরের পরিকল্পনা, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সফল পরিণতি আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি।”
মন্ত্রী আরও বলেন, “শিল্পায়ন, আধুনিকায়ন ও টেকসই উন্নয়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন, নির্ভরযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি অপরিহার্য। পারমাণবিক শক্তি আমাদের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠবে।”
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, “আজ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গৌরবময় দিন। রূপপুরে জ্বালানি লোডিং শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দেশীয় সক্ষমতার বাস্তব প্রতিফলন।”
রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, “বাংলাদেশের জনগণকে আমরা নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বস্ত করতে চাই। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এই কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাবে রোসাটম।”
প্রথম পর্যায়ে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। পরবর্তীতে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ করে উৎপাদন বাড়ানো হবে। প্রথম ইউনিটের পূর্ণ ১,২০০ মেগাওয়াট উৎপাদনে যেতে সময় লাগতে পারে আরও ৮ থেকে ১০ মাস।
এ বছরের শেষ দিকে দ্বিতীয় ইউনিটেও জ্বালানি লোডিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রথম ইউনিটের জন্য কমিশনিং লাইসেন্স প্রদান করে, যার ফলে জ্বালানি লোডিংয়ের পথ উন্মুক্ত হয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকারী নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান জানান, “কেন্দ্র পরিচালনার জন্য ৫২ জন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ লাইসেন্স অর্জন করেছেন। রুশ অপারেটরদের সঙ্গে সমন্বয়ে তারাই কেন্দ্র পরিচালনা করবেন।”
পদ্মা নদীর তীরে ঈশ্বরদীতে নির্মিত এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় নির্মিত কেন্দ্রটিতে রয়েছে দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর। দুটি ইউনিট পূর্ণ উৎপাদনে গেলে কেন্দ্রটি থেকে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশেরও বেশি পূরণ করতে সক্ষম হবে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

