এমএনএ প্রতিবেদক
টানা ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে দেশের হাওরাঞ্চলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম হাওর ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর বোরো ধানের জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে একমাত্র ফসল হারানোর শঙ্কায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে গত কয়েকদিনের অব্যাহত বৃষ্টি ও উজানের পানিতে হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নিকলী আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিনও ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
অষ্টগ্রাম উপজেলার আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের কৃষক ফুল মিয়া বলেন, “১০ একর জমিতে ধান চাষ করেছিলাম। কয়েকদিন পর ঘরে তোলার কথা ছিল। এখন সব পানির নিচে। সারা বছরের স্বপ্ন এখন পানিতে। বুকসমান পানিতে নেমেও কিছু বাঁচাতে পারলাম না। এই ধানই ছিল পরিবারের একমাত্র ভরসা।”
একই এলাকার কৃষক কামরুল ইসলাম জানান, দেড় একর জমির মাত্র ৪০ শতাংশ ধান কাটতে পেরেছেন। বাকিটা পানিতে তলিয়ে গেছে।
“আধাপাকা ধান কেটে নিচ্ছি, কিন্তু তা বাজারে বিক্রি করার মতো না। ঋণের চাপ কীভাবে সামলাবো বুঝতে পারছি না,” বলেন তিনি।

কৃষক বেলাল ভূঁইয়া বলেন, হাওর রক্ষা বাঁধ না থাকায় প্রতিবছরই এমন দুর্যোগের মুখে পড়তে হচ্ছে। “শিবপুর নদীসহ আশপাশের নদীগুলোতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না করলে কৃষকরা টিকে থাকতে পারবে না,” তার মন্তব্য।
অবিরাম বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে হাওরে ধান কাটা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। কৃষি বিভাগ আগে থেকেই ৮০ শতাংশ ধান পাকলেই কাটার পরামর্শ দিলেও বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ পাকা ধানও কাটতে বলা হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ডা. সাদেকুর রহমান বলেন, “জেলায় প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে, যার প্রায় ৫০ শতাংশ কাটা হয়েছে। তবে বৃষ্টির কারণে এখন কাটা সম্ভব হচ্ছে না। আবহাওয়া ভালো হলে দ্রুত বাকি ধান কাটতে হবে।”
মৌলভীবাজারে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার অধিকাংশ পাকা ধান পানির নিচে চলে গেছে। কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি মৌসুমে জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে, যার মধ্যে ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর হাওর এলাকায়।
হাওর এলাকায় প্রায় ৮৩ শতাংশ ধান কাটা হলেও নন-হাওর এলাকায় মাত্র ১৭ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। ফলে বৃষ্টির কারণে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কমলগঞ্জের কৃষক কামাল আহমেদ বলেন, “এক একর জমির ধান চোখের সামনে ডুবে গেলো। এখন কীভাবে পরিবার চালাবো বুঝতে পারছি না।”
অন্য কৃষক সজিব আহমেদ বলেন, “আগাম ধান বিক্রি করে টাকা নিয়েছিলাম। এখন সেই টাকা কীভাবে শোধ করবো? ঘরে খাবারও নেই।”
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, “পানি দ্রুত নেমে গেলে কিছু ধান রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।”
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক প্রণোদনা প্রদান, ক্ষতিগ্রস্তদের ঋণ পুনঃতফসিল করা, স্থায়ী হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমন অনিয়মিত বৃষ্টি ও আকস্মিক ঢল বাড়ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া হাওরাঞ্চলের কৃষিকে টেকসই রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
টানা বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় এখন হাওরের কৃষকরা। আকাশের দিকে তাকিয়ে তাদের একটাই প্রার্থনা—কিছুটা রোদ, যাতে শেষ সম্বলটুকু অন্তত ঘরে তুলতে পারেন।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

