Don't Miss
Home / অর্থনীতি / ব্যাংক খাতের এক-তৃতীয়াংশ আমানত ‘চুরি’, সংকটে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা: গভর্নর মোস্তাকুর রহমান

ব্যাংক খাতের এক-তৃতীয়াংশ আমানত ‘চুরি’, সংকটে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা: গভর্নর মোস্তাকুর রহমান

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

দেশের ব্যাংক খাতের একটি বড় অংশ এখনও গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, কিছু ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বেরিয়ে গেছে এবং মোট আমানতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কার্যত চুরি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং আমানতকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন।

শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন-এ অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গভর্নর এসব কথা বলেন।

একদিন আগে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বাজেট এবং বর্তমান সরকারের আমলে উপস্থাপিত ১৭তম জাতীয় বাজেট।

গভর্ণর বলেন, “একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা স্থিতিশীল করতে সময় ও ধৈর্যের প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে যেসব ব্যাংকে অনিয়ম ও অর্থপাচার হয়েছে, সেগুলোকে পুনরুদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।”

গভর্নর জানান, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-সহ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব আমানতকারী তাদের অর্থ উত্তোলনে সমস্যায় ছিলেন, তারা এখন ধীরে ধীরে টাকা পেতে শুরু করেছেন।

তিনি বলেন, “আমরা ইসলামী ব্যাংককে সাপোর্ট দিতে চাই। ব্যাংকটিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে দ্রুত বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত থাকবে।”

ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগে সরকারের হস্তক্ষেপের অভিযোগ নাকচ করে গভর্নর বলেন, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৫ মার্চ আবেদন গ্রহণের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন সংগ্রহ, প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই ও সাক্ষাৎকার গ্রহণ শেষে মে মাসে নতুন এমডি নির্বাচন করা হয়। পরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী-এর নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশ এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়।

গভর্নর বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক কাউকে ঋণ দেওয়ার নির্দেশ দেয় না, কারও বদলি বা পদোন্নতির ক্ষেত্রেও হস্তক্ষেপ করে না। এ ধরনের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।”

গভর্নর জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত পাঁচ সদস্যের বোর্ডের একজন সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় তাকে গত ১৬ মার্চ পরিবর্তন করা হয়। এর বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছিল না।

ঈদের আগে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদত্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছু মহল অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, ইসলামী ব্যাংক একটি ‘সিস্টেমিক ব্যাংক’; ফলে বোর্ডে ন্যূনতম সদস্যসংখ্যা নিশ্চিত করতে দ্রুত নতুন নিয়োগ দেওয়া জরুরি ছিল।

গভর্নর বলেন, বর্তমানে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার (সিবিএস) সমন্বয়ের কাজ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ বিষয়ে কাজ করছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও আর্থিক সরঞ্জাম (টুলস) রয়েছে বলে জানান গভর্নর।

তিনি বলেন, “প্রয়োজন হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা এসব টুলস প্রয়োগ করব। আমানতকারীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। তারা যেকোনো সময় তাদের টাকা উত্তোলন করতে পারবেন।”

গভর্নর জানান, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইসলামী ব্যাংকের এডি (অ্যাডভান্স-ডিপোজিট) রেশিও ছিল প্রায় ৯৩ শতাংশ। কিন্তু চলতি বছরের মার্চে তা বেড়ে ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশে পৌঁছে যায়, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য অত্যন্ত অস্বাভাবিক।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ব্যাংকটিকে এ হার কমিয়ে আনতে নির্দেশ দিয়েছে। ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদ এ বিষয়ে সচেতন রয়েছে।”

ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের কোনো ঝুঁকি দেখছেন না বলে মন্তব্য করেন গভর্নর। তিনি বলেন, ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা ও বোর্ড পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে এবং প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক জরুরি তারল্য সহায়তা (ইমার্জেন্সি লিকুইডিটি সাপোর্ট) প্রদান করবে।

সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর আরও জানান, দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনবিএফআইয়ের (নন-ব্যাংকিং ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন) সমস্যার সমাধান প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। যেসব গ্রাহক ১০ থেকে ১২ বছর ধরে তাদের অর্থ ফেরত পাচ্ছিলেন না, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তাদের জন্যও কার্যক্রম শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ইকবাল হাসান মাহমুদ, মোহাম্মদ আমিন-উর-রশিদ, আ ন ম এহছানুল হক মিলন, অর্থ সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

x

Check Also

আইডিয়াল স্কুলের মুগদা শাখায় ‘কিশোর গ্যাং’ অভিযোগ: শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনায় আদালতে মামলা, তদন্ত কমিটি গঠন

শিক্ষাঙ্গন প্রতিবেদক রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মুগদা শাখায় ‘কিশোর গ্যাং’-এর আধিপত্য এবং এক শিক্ষার্থীকে ...