Don't Miss
Home / বিশেষ প্রতিবেদন / হাওরাঞ্চলে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ধান তলিয়ে বিপর্যয়, শ্রমিক সংকট ও অনিশ্চয়তায় কৃষক

হাওরাঞ্চলে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ধান তলিয়ে বিপর্যয়, শ্রমিক সংকট ও অনিশ্চয়তায় কৃষক

বিশেষ প্রতিনিধি

টানা বৃষ্টি, বজ্রসহ ঝড়ো হাওয়া এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরগুলোতে বোরো ধান তলিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে শ্রমিক সংকট—সব মিলিয়ে কৃষকদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম উৎকণ্ঠা ও হতাশা।

হাওরাঞ্চলে এবারের বোরো মৌসুমে প্রকৃতির বৈরী আচরণ কৃষকের ঘামঝরা পরিশ্রমকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র জানতে সময় লাগলেও এটি যে বড় ধরনের কৃষি বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে—সে আশঙ্কা এখন স্পষ্ট। কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে দ্রুত ক্ষতিপূরণ, শ্রমিক সহায়তা ও পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারের বিরইমাবাদ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দূর থেকে কৃষকদের কর্মব্যস্ততা উৎসবের মতো মনে হলেও বাস্তবে তা বাঁচার লড়াই। পানির সঙ্গে সময়ের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন তারা—যতটুকু সম্ভব ধান কেটে ঘরে তোলার মরিয়া চেষ্টা চলছে।

স্থানীয় কৃষক দুলাল মিয়া জানান, মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে পানি এতটাই বেড়েছে যে তাঁর ৩০ কিয়ার জমির অধিকাংশই পানির নিচে চলে গেছে। তিনি বলেন, “ধান পাকছে, কিন্তু কাটার সময় পাইতেছি না। পানি কমলে কিছু ভাসা ধান বাঁচানো যাইত।”

একই এলাকার কৃষক শাহজান মিয়া বলেন, পাঁচ কিয়ারের বেশি জমির অর্ধেকও তুলতে পারেননি। ইতোমধ্যে পানিতে ডুবে গেছে ধানের শীষ।

কবির মিয়ার কণ্ঠে হতাশা আরও স্পষ্ট: “ধান এখন নৌকার, কৃষক হইছে ফকির।”

ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যাঁরা আছেন, তাঁদের দৈনিক মজুরি ৭০০ থেকে ১,০০০ টাকা। সঙ্গে যাতায়াত ভাড়া ও নৌকা ভাড়ার অতিরিক্ত খরচ যোগ হওয়ায় ব্যয় বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। তবুও সময়মতো শ্রমিক না পাওয়ায় অনেক কৃষক নিজেরাই পানিতে নেমে ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন।

কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও জমিতে পানি জমে থাকায় অধিকাংশ জায়গায় যন্ত্র ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না।

কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, মৌলভীবাজারে ইতোমধ্যে অন্তত ৯৪১ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া শিলাবৃষ্টিতে প্রায় ৩৫০ হেক্টর জমির ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অন্যদিকে সুনামগঞ্জে ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হলেও এর বড় অংশ ঝুঁকির মুখে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫১ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, অন্তত ১৩ হাজার ৭৯ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যদিও হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতাদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ ৫০ হাজার হেক্টরেরও বেশি হতে পারে।

নেত্রকোনার বিভিন্ন হাওরে অন্তত ৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমির ধান নিমজ্জিত হয়েছে। কংস ও উব্দাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কিশোরগঞ্জের নিকলী, করিমগঞ্জ ও বাজিতপুর এলাকাতেও চার দিন পর রোদ উঠলে কৃষকেরা আবার ধান কাটায় নেমেছেন। তবে আবহাওয়া অনিশ্চিত থাকায় স্বস্তি স্থায়ী হচ্ছে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। যেখানে পুরো মাসে ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টির কথা, সেখানে মাত্র দুই দিনেই প্রায় ২৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

পাউবোর কর্মকর্তারা বলছেন, বড় ধরনের বৃষ্টি না হলে পানি ধীরে ধীরে কমতে পারে। তবে আকাশে মেঘ থাকায় আবার বৃষ্টির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সুনামগঞ্জের কৃষক আবদুল মালিকের মতো অনেকেই ঋণ করে চাষ করেছেন। তাঁর ২৯ বিঘার মধ্যে ২০ বিঘা জমির ধান তলিয়ে গেছে। সম্ভাব্য ৪০০ মণ ধানের বদলে এখন হয়তো ৬০–৭০ মণ ধানও পাওয়া যাবে না।

তিনি বলেন, “আর কয়দিন সময় পাইলে ধান তুলতে পারতাম। এখন সব শেষ।”

এই বোরো ধানের ওপরই নির্ভর করে কৃষকের সারা বছরের খাদ্য, চিকিৎসা ও পারিবারিক খরচ। ফলে এই ক্ষতি শুধু মৌসুমি নয়, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকট ডেকে আনবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওরের নালা-খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’-এর নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, আবার ভারী বৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢল নামলে বিদ্যমান বাঁধ দিয়ে বাকি ফসল রক্ষা করা কঠিন হবে।

চার দিনের টানা বৃষ্টির পর অল্প সময়ের রোদে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও কৃষকদের উদ্বেগ কাটেনি। অনেকেই বলছেন, “এই রোদটা থাকলে কিছু ধান বাঁচানো যাইত।”

কিন্তু আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং পানির ধীরগতির নিষ্কাশন পরিস্থিতিকে এখনও ঝুঁকিপূর্ণ রেখেছে।

x

Check Also

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স আজ গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে: রাষ্ট্রপতি

এমএনএ প্রতিবেদক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স আজ যে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে, ...