এমএনএ স্পোর্টস ডেস্ক : আয়ারল্যান্ডকে আগের ম্যাচে হারিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজ ইতোমধ্যেই জিতে নিয়েছে নিউজিল্যান্ড। তবু আজকের ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য হয়ে গেল অনেক কিছু পাওয়ার এক ম্যাচ।
এই প্রথম নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বিদেশের মাটিতে জিতল বাংলাদেশ। তবে এর চেয়েও বড় উপলক্ষ হয়ে এল এই তথ্য—এই জয় দিয়ে র্যাঙ্কিংয়ের ছয় নম্বর জায়গাটি নিশ্চিত করল বাংলাদেশ। ওয়ানডেতে এটিই বাংলাদেশের সেরা র্যাঙ্কিং-অর্জন। এই জয়ে এটিও প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেল, বিশ্বকাপে খেলতে আর বাছাই পর্বের ঝামেলায় যেতে হবে না মাশরাফির দলকে।
সেইসঙ্গে শ্রীলঙ্কাকে টপকে র্যাঙ্কিংয়ের ছয় নম্বরে ওঠে আসলো মাশরাফির দল। যদিও এখনো আইসিসি থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত সময়সীমার মধ্যে র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ আটে থাকা দলগুলো ২০১৯ সালের বিশ্বকারে সরাসরি জায়গা করে নেবে। ৯ নম্বরে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজ (৭৯) বাংলাদেশের (৯৩) চেয়ে ১৪ পয়েন্ট পিছিয়ে থাকায় এই ব্যবধান ঘুচিয়ে টাইগারদের টপকে সরাসরি বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়া ক্যারিবিয়ানদের জন্য প্রায় অসম্ভব।
আজকের ম্যাচটা রং বদলেছে বহুবার। এ কারণে শেষ দিকে সমীকরণ বাংলাদেশের দিকে হেলে থাকলেও শঙ্কা তো ছিলই। ম্যাচটা শুরু থেকে পেন্ডুলামের মতোই দুলল শুধু। একবার এদিক যায় তো, একটু পরেই ওদিক। ইনিংসের প্রথম বলেই ছক্কা, তৃতীয় বলে আবার আউট সৌম্য। কখনো তামিম ইকবাল (৬৫) ও সাব্বির রহমানের (৬৫) ১৩৬ রানের জুটিতে পরিষ্কার বিজয় দেখছে বাংলাদেশ, আবার ক্ষণিকের পাগলামোতে ১৭ রানের মধ্যে নেই ৩ উইকেট!
ডাবলিনের ক্লনটার্ফ ক্রিকেট ক্লাব গ্রাউন্ডে আগে ব্যাটিংয়ে নেমে দুর্দান্ত শুরুর পর বাংলাদেশি বোলারদের অসাধারণ কামব্যাকে নির্ধারিত ৫০ ওভার শেষে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৭০ রানে আটকে যায় নিউজিল্যান্ড। জবাবে ব্যাটিংয়ে নেমে ব্যাটসম্যানদের দায়িত্বশীলতায় ১০ বল ও ৫ উইকেট হাতে রেখেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ।
দলীয় ৭ রানের মাথায় বাংলাদেশ সৌম্য সরকারকে হারানোর পর তামিম ইকবাল ও সাব্বির রহমানের দুর্দান্ত জুটিতে কক্ষপথে ফেরে বাংলাদেশ। এরপর ‘মিনি ধস’ নামলেও সাকিবের ছোট ইনিংসে কক্ষপথে ফেরে টাইগাররা। মুশফিকুর রহীম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ মিলে দারুণ জুটি গড়ে তুলির শেষ আঁচড়টা দেন।
তামিম ৮০ বলে ৬টি চার ও ১টি ছক্কার সাহায্যে ৬৫ রান করে আউট হন। সাব্বির ৮৩ বলে ৯টি চারের সাহায্যে সমান ৬৫ রান করে রানআউট হয়ে সাজঘরে ফেরেন। মুশফিক ৪৫ বলে ৪৫ ও মাহমুদউল্লাহ ৩৬ বলে করেন ৪৬ রান। মোসাদ্দেক ১৩ বলে ১০ রান করে আউট হন। সাকিব আউট হওয়ার আগে করেন ১৯ রান।
নিউজিল্যান্ডের হয়ে জিতান প্যাটেল সর্বোচ্চ দুটি উইকেট নেন। একটি করে উইকেট নেন হামিশ বেনেট ও মিচেল স্যান্টনার।
২৭১ রানের লক্ষ্যে বাংলাদেশের হয়ে যথারীতি ইনিংস ওপেন করতে নামেন সৌম্য সরকার ও তামিম ইকবাল। আগের দুই ম্যাচে দারুণ ব্যাটিং করলেও এদিন ব্যর্থ হয়ে মাঠ ছাড়েন সৌম্য। প্রথম ওভারেই জিতান প্যাটেলকে দিয়ে স্পিন অ্যাটাক শুরু করে চমকে দেয় নিউজিল্যান্ড। প্রথম বলে এগিয়ে এসে দারুণ ছক্কা হাঁকিয়ে বাংলাদেশি দর্শকদের আনন্দে ভাসান তামিম। তবে তৃতীয় বলেই সেই আনন্দ স্তিমিত হয়ে যায়। সৌম্য ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে কোরি অ্যান্ডারসনকে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরলে হোঁচট খায় বাংলাদেশ।
এরপর তামিম-সাব্বিরের দৃঢ়তায় মজবুত ভিত পায় বাংলাদেশ। মিচেল স্যান্টনারের করা ২৭তম ওভারের শেষ বলে হামিশ বেনেটের কাচে ক্যাচ দিয়ে তামিম ফিরে গেলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতেই ছিল। স্যান্টনারের করা ২৯তম ওভারের দ্বিতীয় বলে মোসাদ্দেকের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিতে সাব্বির রানআউট হয়ে ফিরে গেছে ছন্দপতন ঘটে বাংলাদেশের।
এরপর জিতান প্যাটেলের করা ৩০তম ওভারের চতুর্থ বলে মোসাদ্দেক লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়লে চাপের মুখে পড়ে টাইগাররা। সাকিব-মুশফিক মিলে ৫২ বলে ৩৯ রানের দারুণ জুটি গড়ে বাংলাদেশকে কক্ষপথে ফেরান। হামিশ বেনেটের করা ৩৯তম ওভারের দ্বিতীয় বলে লং লেগে সাকিব ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরে গেলে সমীকরণ বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে যায়।
সাকিব ফিরে যাওয়ার পর বাংলাদেশের দুই অভিজ্ঞ সেনানি মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিক জুটি বাঁধেন। এই দুজনের দিকেই তাকিয়ে ছিল বাংলাদেশ। টাইগার সমর্থকদের হতাশ করেননি দুই ভায়রা ভাই। সাহসী সব শটে দুর্দান্ত খেলেছেন মুশফিকুর রহিম। স্কুপ করছেন, রিভার্স সুইংও। তাঁর আত্মবিশ্বাস ছুঁয়ে গেল মাহমুদউল্লাহকেও। ভাগ্যও সঙ্গী হলো এ দুজনের। দুর্দান্ত এক জুটি গড়ে
বাংলাদেশকে স্মরণীয় জয় এনে দেন মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ। ৬০ বলে ৭২ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে দলকে জিতিয়েই মাঠ ছাড়েন দুজন।
মাহমুদউল্লাহ ৩৬ বলে ৪৬ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন। তার ইনিংসটি ছিল ছয়টি চার ও একটি ছক্কায় সাজানো। মুশফিক ৪৫ বলে ৪৫ রানের কার্যকরী ইনিংস খেলেন। তার ইনিংসটি ছিল ৩টি চার ও একটি ছক্কায় সাজানো। দুজনই শেষ পর্যন্ত অপরাজিত ছিলেন।
তিন জাতি সিরিজের প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হার এবং অ্যাওয়ে ম্যাচে কিউইদের বিপক্ষে কোনো জয় না পাওয়ার আক্ষেপ নিয়ে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ। আগের হারের প্রতিশোধ নেয়ার পাশাপাশি আক্ষেপ ঘুচানোর লক্ষ্য টাইগারদের। সেইসঙ্গে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে র্যাঙ্কিংয়ে এক ধাপ এগিয়ে সরাসরি ২০১৯ বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়ার পথে এগিয়ে যাওয়ার মঞ্চ।
এর আগে ডাবলিনের ক্লনটার্ফ ক্রিকেট ক্লাব গ্রাউন্ড মাঠে টস জিতে প্রতিপক্ষকে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানান মাশরাফি। শুরুটা নিউজিল্যান্ড দুর্দান্ত করলেও শেষ দিকে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। ফলে নির্ধারিত ওভার শেষে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৭০ রানেই আটকে যায় কিউইরা।
নিউজিল্যান্ডের হয়ে টম ল্যাথাম সর্বোচ্চ ৮৪ রান করেন। এছাড়া নেইল ব্রম ৬৩ এবং রস টেলর করেন ৬০ রান। এছাড়া কোরি অ্যান্ডারসন ২৪ রানের ইনিংস খেললেও লুক রনকি (২), মিচেল স্যান্টনার (০) ও জেমস নিশাম (৬) ব্যর্থ হয়েই ফেরেন।
বাংলাদেশের হয়ে দুটি করে উইকেট নেন নাসির হোসেন, সাকিব আল হাসান ও মাশরাফি। একটি করে উইকেট নেন মোস্তাফিজুর রহমান ও রুবেল হোসেন।
আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে ভেস্তে যায়। পরের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরে গেলেও তৃতীয় ম্যাচে আইরিশদের ৮ উইকেটের বড় ব্যবধানে পরাজিত করে টাইগাররা। বুধবার নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করেই বৃহস্পতিবার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির জন্য ইংল্যান্ডের বিমান ধরবে বাংলাদেশ।
সিরিজের সিরিজ শেষে বৃহস্পতিবার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিকে সামনে রেখে ইংল্যান্ডে যাবে বাংলাদেশ। ১-১৮ জুন ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের মাটিতে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আসর বসবে। ১ জুন উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। ‘এ’ গ্রুপে টাইগারদের অপর দুই প্রতিপক্ষ হলো অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড।
বাংলাদেশ একাদশ: তামিম ইকবাল, সৌম্য সরকার, সাব্বির রহমান, মুশফিকুর রহীম, সাকিব আল হাসান, মোসাদ্দেক হোসেন, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, নাসির হোসেন, রুবেল হোসেন, মাশরাফি বিন মুর্তজা ও মোস্তাফিজুর রহমান।
নিউজিল্যান্ড একাদশ: লুক রনকি, টম ল্যাথাম, কোরি অ্যান্ডারসন, রস টেলর, নেইল ব্রম, জেমস নিশাম, কলিন মুনরো, হামিশ বেনেট, মিচেল স্যান্টনার, ম্যাট হেনরি ও জিতান প্যাটেল।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
নিউজিল্যান্ড: ৫০ ওভারে ২৭০/৮ (ল্যাথাম ৮৪, ব্রুম ৬৩, টেলর ৬০*, অ্যান্ডারসন ২৪; সাকিব ২/৪১, নাসির ২/৪৭, মাশরাফি ২/৫২, মোস্তাফিজ ১/৪৬, রুবেল ১/৫৬, মোসাদ্দেক ০/১৪)।
বাংলাদেশ: ৪৮.২ ওভারে ২৭১/৫ (তামিম ৬৫, সৌম্য ০, সাব্বির ৬৫, মোসাদ্দেক ১০, মুশফিক ৪৫*, সাকিব ১৯, মাহমুদউল্লাহ ৪৬*; প্যাটেল ২/৫৫, বেনেট ১/৪৩, স্যান্টনার ১/৫৩)।
ফল: বাংলাদেশ ৫ উইকেটে জয়ী।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: মুশফিকুর রহিম।
ম্যান অব দ্য সিরিজ: টম ল্যাথাম।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

