এমএনএ প্রতিবেদক
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বৃষ্টিপাতের ফলে রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এবং দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল শহরে ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) সকাল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, আবাসিক এলাকা এবং অলিগলিতে পানি জমে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, পরিবহনচালক ও ব্যবসায়ীরা দিনের শুরুতেই দুর্ভোগে পড়েন। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে আগামী কয়েকদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে, ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজধানী ঢাকায় সকাল থেকেই মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির কারণে মালিবাগ, শান্তিনগর, সায়েদাবাদ, শনির আখড়া, পুরান ঢাকা, বংশাল, নাজিমুদ্দিন রোড, ধানমন্ডি, মিরপুর-১৩, হাতিরঝিল, আগারগাঁও, ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর, মেরুল বাড্ডা, ডিআইটি প্রজেক্ট, ইসিবি চত্বর এবং কালশীসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। সড়কে পানি জমে যাওয়ায় যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করে এবং কোথাও কোথাও দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। অনেক এলাকায় গণপরিবহনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বাড়ে। কর্মজীবী মানুষদের অনেককে ছাতা মাথায় হাঁটতে দেখা যায়, আবার কেউ কেউ রিকশা বা সিএনজি না পেয়ে পায়ে হেঁটেই গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
মহাখালী এলাকার সিএনজিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, “সকাল থেকে বিরতিহীন বৃষ্টি হচ্ছে। মানুষের উপস্থিতি কম, রাস্তায় পানি জমে থাকায় গাড়ি চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। ভোর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি ট্রিপ পেয়েছি।” গুলশানের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী এহসানুল হক বলেন, “সকালে বাসা থেকে বের হয়ে দেখি রাস্তায় পানি। বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতার কারণে অফিসে পৌঁছাতে অনেক সময় লেগেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ আজ বাইরে বের হয়নি।”
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মুখপাত্র রাসেল রহমান জানিয়েছেন, বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা মাঠে কাজ করছেন। তিনি বলেন, অতিরিক্ত পানি দ্রুত অপসারণের জন্য কমলাপুর পাম্প স্টেশন চালু করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ ড্রেন ও নালা পরিষ্কারের কাজ জোরদার করা হয়েছে। তবে নগরবাসীর অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা এলেই একই ধরনের দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান দৃশ্যমান নয়।
এদিকে চট্টগ্রাম নগরীতে মঙ্গলবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে নগরীর প্রবর্তক মোড়, মুরাদপুর, চকবাজার, কাতালগঞ্জ, বহদ্দারহাট ও হালিশহরের বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। বুধবার সকালেও অনেক এলাকায় পানি পুরোপুরি নামেনি। নিচু বসতিপূর্ণ এলাকায় ঘরের সামনে ও অলিগলিতে পানি আটকে থাকায় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। অনেককে জুতা হাতে নিয়ে পানি মাড়িয়ে কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে দেখা গেছে।
কাতালগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা পারভীন আক্তার বলেন, “আমার বাসার সামনে এখনো তিন-চার ইঞ্চি পানি জমে আছে। বাজারে যেতে জুতা খুলে যেতে হয়েছে। পানি নেমে গেলেও কাদা আর ময়লায় চলাচল কষ্টকর হয়ে উঠেছে।” স্থানীয়দের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা নিরসনে বহু প্রকল্প নেওয়া হলেও সামান্য বৃষ্টিতেই পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। খাল ও ড্রেন পরিষ্কারের কাজ চললেও দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা এখনও নিশ্চিত হয়নি।
বরিশালেও একই চিত্র দেখা গেছে। সাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে বুধবার সকাল থেকে মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। নগরীর নিচু অঞ্চলগুলোতে হাঁটুসমান পানি জমে যায়। অফিসগামী মানুষ, স্কুল শিক্ষার্থী ও পথচারীদের দুর্ভোগ বেড়ে যায়। যানবাহনের সংকটের কারণে অনেককে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হয়। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় বরিশালে ৬৩ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে এবং আগামী তিন দিন একই ধরনের আবহাওয়া থাকতে পারে।
জাতীয় সংসদে এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হচ্ছে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও বর্জ্য ফেলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা নষ্ট করে ফেলা। তিনি সংসদ সদস্যদের জনগণকে সচেতন করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমরা যদি জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে পারি, তাহলে এই সমস্যার অনেকাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব।”
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জলাবদ্ধতা শুধু চট্টগ্রাম বা ঢাকার সমস্যা নয়; এটি এখন সারাদেশের নগর ব্যবস্থাপনার বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। তিনি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য খাল পুনঃখনন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নগর পরিকল্পনায় বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রাকৃতিক খাল ভরাট, ড্রেনেজ লাইনে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই নগরীগুলো জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। তারা মনে করছেন, কেবল তাৎক্ষণিক পানি সরিয়ে নয়, বরং সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক দায়িত্ববোধের মাধ্যমেই এ সমস্যা থেকে স্থায়ীভাবে উত্তরণ সম্ভব।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
