বিশেষ প্রতিবেদন
দেশে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে ম্যালেরিয়া সংক্রমণ। পরজীবীবাহিত এই রোগটি মূলত সংক্রমিত স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে এক শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তার মৃত্যু এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে সংক্রমণ বৃদ্ধির খবর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে পার্বত্য এলাকা থেকে ফিরে আসা ভ্রমণকারীদের মাধ্যমে সমতলে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৪৬০ জন, যা আগের বছরের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি সরকারের ২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
গত বছর দেশের ১৩টি জেলায় মোট ১০ হাজার ১৬২ জন আক্রান্ত হন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বান্দরবান, যেখানে মোট আক্রান্তের প্রায় অর্ধেক। এছাড়া রাঙামাটি, কক্সবাজার ও খাগড়াছড়িও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রয়েছে।
সম্প্রতি একটি পর্যটক দলের কয়েকজন সদস্য পার্বত্য অঞ্চলে ভ্রমণ শেষে ঢাকায় ফিরে জ্বরে আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। চিকিৎসকদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান, তাঁবুতে রাতযাপন এবং মশা প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে।
সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভ্রমণের তিন সপ্তাহ থেকে এক মাসের মধ্যে জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা বা দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত ম্যালেরিয়া পরীক্ষা করা জরুরি। দেরি হলে রোগটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে এখনো সর্বত্র ম্যালেরিয়ার ওষুধ সহজলভ্য নয়। ফলে রোগ শনাক্ত হলে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে রোগটি পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও আইইডিসিআরের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ ম্যালেরিয়া নির্মূলে একটি সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
তিনি বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণ, কীটনাশকযুক্ত মশারির ব্যবহার বৃদ্ধি, টিকাদান এবং মানুষের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া অপারেশন প্ল্যান বন্ধ থাকায় মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, যা পুনরায় জোরদার করা প্রয়োজন।
তবে বাস্তবতা হলো—মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে স্থবিরতা এবং বরাদ্দ অর্থের সঠিক ব্যবহার না হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। গত ছয় বছরে ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচিতে ৬০০ কোটির বেশি টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে।
সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যু শূন্যে নামানো এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সংক্রমণ নির্মূলের পরিকল্পনা নিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সংক্রমণ বৃদ্ধির ধারা এই লক্ষ্য অর্জনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আরও ৬–৭ বছর সময় লাগতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাদের মতে— মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা; কীটনাশকযুক্ত মশারির ব্যবহার বাড়ানো; দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা; স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা ও বন্ধ থাকা অপারেশন প্ল্যান পুনরায় চালু করা।
এছাড়া, পার্বত্য অঞ্চল বা বিদেশ ভ্রমণ শেষে জ্বর হলে তা অবহেলা না করে পরীক্ষা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া একসময় নিয়ন্ত্রণে এলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আবারও সতর্ক হওয়ার বার্তা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। সময়োপযোগী কৌশল, সঠিক তদারকি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই এই রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

