ঢাকাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে চ্যাম্পিয়ন রংপুর রাইডার্স
Posted by: News Desk
December 13, 2017
এমএনএ স্পোর্টস ডেস্ক : বিপিএলের পঞ্চম আসরের ফাইনালে ঢাকাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে নতুন চ্যাম্পিয়ন হয়েছে রংপুর রাইডার্স। ফাইনালে হাইভোল্টেজ ম্যাচে রোমাঞ্চকর লড়াই দেখার অপেক্ষাতেই ছিলেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। মুখোমুখি দুই শক্তিশালী দল ঢাকা ডায়নামাইটস ও রংপুর রাইডার্স। তবে সেই রোমাঞ্চে জল ঢেলে দিলেন ক্রিস গেইল। তার তাণ্ডবে ফাইনালটিকে একপেশে বানিয়ে ফেলে রংপুর। একক আধিপত্য বিস্তার করে ঢাকাকে ৫৭ রানে পরাজিত করে বিজয় উৎসব করে মাশরাফি বিন মুর্তজার রংপুর।
মিরপুরের শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে টসে জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন ঢাকার অধিনায়ক সাকিব। ক্রিস গেইলের বিধ্বংসী সেঞ্চুরিতে নির্ধারিত ২০ ওভার শেষে মাত্র ১ উইকেট হারিয়ে ২০৬ রানের পাহাড় গড়ে রংপুর। জবাবে ব্যাটিংয়ে নেমে নির্ধারিত ওভার শেষে ৯ উইকেট হারিয়ে ১৪৯ রানে আটকে যায় ঢাকা ডায়নামাইটস।
বিপিএলে এটি রংপুরের প্রথম শিরোপা। অন্যদিকে আগের চার আসরে তিনবার ফাইনালে ওঠে তিনবারই শিরোপা জয় করা ঢাকা চতুর্থ ফাইনালে বড় হার সঙ্গী করে মাঠ ছাড়ে।
রংপুরকে শিরোপা জিতিয়ে নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে গেলেন মাশরাফি। এই নিয়ে চারবার টুর্নামেন্টের ফাইনালে ওঠেন তিনি। চারবার অধিনায়ক হিসেবে শিরোপা জয়ের উৎসব করেন মাশরাফি।
টসে হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে গেইলের তাণ্ডবে রানের পাহাড় গড়ে রংপুর রাইডার্স। দলীয় ৬ রানের মাথায় জনসন চার্লসের উইকেট হারায় রংপুর। এরপর গেইল ও ম্যাককালাম মিলে ১০৭ বলে ২০১ রানের হার না মানা জুটি গড়ে দলকে বড় সংগ্রহ এনে দেন।
গেইল ৬৯ বলে ৫টি চার ও ১৮টি ছক্কার সাহায্যে ১৪৬ রানের হার না মানা ইনিংস খেলে দলকে রানের পাহাড় এনে দেন। অন্যদিকে ম্যাককালাম ৪৩ বলে ৫১ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন। মজার ব্যাপার হলো- ২০ ওভার শেষে ঢাকা করতে পেরেছে গেইলের চেয়ে মাত্র তিন রান বেশি।
তবে অতিরিক্তি রান বাদ দিলে স্কোরলাইন আরো দৃষ্টিকটু হয়ে পড়ে। রংপুরের বোলাররা ১৩টি অতিরিক্ত রান দেন। সেগুলো বাদ দিলে ফলাফল দাঁড়ায়- গেইল ১৪৬: ১৩৬ ঢাকার ১১ ব্যাটসম্যান।
ক্রিস গেইল আকাশছোঁয়া ছক্কা হাঁকাবেন, নন স্ট্রাইকে দাঁড়িয়ে দেখবেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। বাংলাদেশে পৌঁছে এভাবেই বলেছিলেন নিউজিল্যান্ডের সাবেক এই অধিনায়ক। আগের কয়েক ম্যাচে সেটা দেখার কিছুটা সুযোগ হয়েছে ম্যাককালামের। কিন্তু সবচেয়ে বড় ধামাকাটা দেখলেন ফাইনালে। তাকে এক পাশে রেখে ছক্কার বৃষ্টি নামিয়ে সব রেকর্ড গুড়িয়ে দিলেন ক্যারিবিয়ান ব্যাটিং দৈত্য।
গেইল তাণ্ডব, সাথে ম্যাককালামের দায়িত্বশীল ইনিংস। তাতে মাত্র এক উইকেটে ২০৬ রানের বিশাল সংগ্রহ রংপুরের ঝুলিতে। যা পাড়ি দিতে নেমে পুরোটা সময় মাঝ দরিয়াতেই থেকেছে ঢাকা ডায়নামাইটস। ১৪৯ রানেই ইনিংস শেষ। ফল, রংপুর রাইডার্স ম্যাচ জিতে নিল ৫৭ রানের ব্যবধানে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) পেল নতুন চ্যাম্পিয়ন। পঞ্চম আসরের শিরোপা উঠল মাশরাফি বিন মুর্তজার দল রংপুর রাইডার্সের ঝুলিতে।
বিপিএল, মাশরাফি ও শিরোপা। শব্দগুলো যেন একে অন্যের হয়ে কথা বলে। সহজ ভাষায় প্রতিশব্দই বলা যায়। আগের চার আসরের তিনটিতেই শিরোপা উচিয়ে ধরছেন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। পঞ্চম আসরেও মাশরাফি উপখ্যান। রংপুর রাইডার্সের অধিনায়কের হাতে শোভা পেল বিপিএলের পঞ্চম আসরের শিরোপা। অধিনায়ক হিসেবে বিপিএলের চতুর্থ শিরোপা জিতলেন তিনি।
ইতিহাস পক্ষেই ছিল। বিপিএলের ফাইনালে কখনই হারেননি অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। প্রথম দুইবার ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্সের হয়ে জিতেছেন শিরোপা। তৃতীয় আসরে এসে কুমিল্লাকে শিরোপা এনে দেন। চতুর্থ আসরে কুমিল্লাকে ফাইনালের লড়াইয়ে নিয়ে যেতে পারেননি। পঞ্চম আসরে এসে আবারও অধিনায়ক মাশরাফির বাজিমাত। গেইল, ম্যাককালাম, চার্লস, মিথুনদের নিয়ে আরও একবার বিপিএলের শিরোপা ছুঁয়ে দেখলেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের ওয়ানডে অধিনায়ক।
মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আগে বোলিং করে বড় টার্গেটের নিচে পড়তে হয় ঢাকাকে। কিন্তু ২০৭ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে তাদের শুরুটা হল দুঃস্বপ্নের মতো। দলের রান খাতা শূন্য থাকতেই বিদায় ওপেনার মেহেদী মারুফ। তাকে সাজঘর দেখিয়ে দেন রংপুরের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। প্রথম উইকেটের চাপ সামলে ওঠার আগেই জো ডেনলির বিদায়। ইংলিশ এই ব্যাটসম্যানও মারুফের মতো রানের খাতা খোলার আগেই থেমেছেন।
এক রানেই নেই দুই উইকেট। ঢাকা তখন দিশেহারা। এই চাপ আরও বাড়ল কিছুক্ষণ পরই। দলীয় ১৯ রানের মাথায় এভিন লুইসকে নিজের দ্বিতীয় শিকারে পরিণত করে ঢাকাকে পথ ভুলিয়ে দেন রংপুরের স্পিনার সোহাগ গাজী। পথহারা ঢাকা ১০ রান পর হারায় কাইরন পোলার্ডের উইকেটও। ২৯ রানেই চার উইকেট হারানো সাকিবের দলকে তখন থেকেই হারের চোখ রাঙানি সহ্য করতে হচ্ছিল।
এসময় কিছুটা প্রতিরোধ। জহুরুল ইসলাম অমিকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে থাকেন অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। যদিও এই জুটি দীর্ঘ হয়নি। ৭১ রানের মাথায় ফিরে যান সাকিব। তার করা ২৬ রান ঢাকাকে বিন্দুমাত্র স্বস্তিও দিতে পারেনি। এরপর দ্রুত বিদায় নিয়েছেন মোসদ্দেক হোসেন সৈকত ও শহীদ আফ্রিদি। তাই তো অনেকটা সময় লড়ে জহুরুল ইসলাম অমির ৩৮ বলে চারটি চার ও দুটি ছক্কায় করা ৫০ রান হারের ব্যবধানই কমিয়েছে মাত্র।
ঢাকার হয়ে জহুরুল ইসলাম সর্বোচ্চ ৫০ রান করেন। এছাড়া সাকিব ২৬ এবং এভিন লুইস করেন ১৫ রান।
রংপুর রাইডার্সের হয়ে দুটি করে উইকেট নেন সোহাগ গাজী, ইশুরু উদানা ও নাজমুল ইসলাম। একটি করে উইকেট নেন মাশরাফি, রুবেল হোসেন ও রবি বোপারা।
এর আগে টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নামে রংপুর রাইডার্স। শিরোপা যুদ্ধের লড়াইয়ে রংপুরের শুরুটা হয় খুবই বাজেভাবে। আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান জনসন চার্লস এদিন শুরুতেই দিকহারা। দলীয় পাঁচ রানেই বোলার সাকিব আল হাসানের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান ডানহাতি এই উইন্ডিজ ব্যাটসম্যান। অবশ্য শুরুতেই উইকেট হারালেও রংপুরকে বিপদে পড়তে হয়নি।
প্রাচীর গড়ে তোলেন ক্যারিবীয় ব্যাটিং দানব ক্রিস গেইল ও ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। রয়েসয়েই শুরু করেন দুজন। ক্রমেই ব্যাটিংয়ের ধার বাড়িয়েছেন এই ম্যাচ দিয়ে টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ১১ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করা গেইল। অন্য পাশে মারকুটে ম্যাককালাম থাকলেও সেটার ধার ধারেননি ঢাকার বোলারদের জন্য যমদূত হয়ে ওঠা গেইল। চার-ছক্কার বন্যা বইয়ে দিয়ে ৩৩ বলে তুলে নেন হাফ সেঞ্চুরি।
এরপরই আসল ব্যাটিং শো। ক্রমেই ভয়নাক হয়ে উঠতে শুরু করেন গেইল। যেন ভুলেই গেলেন বাউন্ডারি নামক কিছু একটা আছে। ঢাকার বোলারদের বলকে কচুকাটা করার পথে ব্যাটটাকে পরিণত করলেন খোলা তরবারিতে। অপর পাশে দাঁড়িয়ে ম্যাককালাম চেয়ে চেয়ে দেখে গেছেন গেইল তাণ্ডব। মাঝে মধ্যে দুই-একটি চার-ছয় হাঁকিয়ে জানান দিয়েছেন নিজের উপস্থিতির।
৩৩ বলে হাফ সেঞ্চুরি করা গেইল সেঞ্চুরি পূরণ করতে খরচা করলেন ২৪ বল। ৫৭ বলে সেঞ্চুরি পূরণ। তাতে থাকল চারটি চার ও ১১টি ছক্কার মার। বিপিএলের পঞ্চম সেঞ্চুরি করার পথে টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ১১ হাজার রানের মাইলফলকও ছুয়ে ফেলেন জ্যামাইকান ব্যাটিং ঝড়। সেঞ্চুরি পূরণের পর আরও বিধ্বংসী চেহারায় গেইল। একের পর এক ছক্কা হাঁকাতে থাকেন এই সিক্স মেশিন।
ম্যাককালাম তখনও নির্ভার ব্যাটিং করে যাচ্ছিলেন। দুই-একটি বাউন্ডারির পাশাপাশি সিঙ্গেল নিয়ে স্ট্রাইক প্রান্তে পাঠাচ্ছিলেন গেইলকে। আর টি-টোয়েন্টির সেরা ব্যাটসম্যান স্ট্রাইক প্রান্তে গিয়েই ঢাকার বোলারদের ছন্নছাড়া করে দিচ্ছিলেন। এভাবে চলেছে ইনিংসের শেষপর্যন্ত। শেষ ৪৬ রান তুলতে মাত্র ১২ বল খরচা করেছেন গেইল। হাঁকিয়েছেন আরও সাতটি ছয়। সব মিলিয়ে ১৮টি। যা ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম। কোনও ফরম্যাটের এক ইনিংসে ১৮ ছক্কা মারতে পারেনি কোনও ব্যাটসম্যান। সর্বোচ্চ ছিল ১৭টি। সেটাও গেইলেরই করা।
শেষপর্যন্তও গেইল ও ম্যাককালামকে ফেরাতে পারেননি ঢাকার বোলাররা। উল্টো রানের বন্যায় ভেসে যেতে হয়েছে তাদের। বল হাতে সুনীল নারাইনই কেবল সম্মান আদায় করে নিতে পেরেছেন। বাকিরা কেবল রান খরচা করেই গেছেন। গেইল-ম্যাককালাম জুটিও রেকর্ড গড়েছে। তাদের করা ২০১ রান বিপিএলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রানের জুটি।
রংপুরকে ২০৬ রানের বিশাল সংগ্রহ এনে দেওয়ার পথে ৬৯ বলে পাঁচটি চার ও ১৮টি ছক্কায় ১৪৬ রানে অপরাজিত থাকেন গেইল। ম্যাককালাম ৪৩ বলে চারটি ও তিনটি ছক্কায় ৫১ রানের হার না মানা এক ইনিংস খেলেন। তবে গেইল ২২ রান করেই ফিরতে পারতেন। কিন্তু মোসাদ্দেকের বলে গেইলের তোলা ক্যাচ মাটিতে ফেলে দেন ঢাকার অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। গেইলের ক্যাচ তো নয়, যেন ম্যাচের ভাগ্যই মাটিতে ফেলে দেন সাকিব।
এক ম্যাচ দিয়েই রেকর্ডের বন্যা বইয়ে দিলেন ম্যাচসেরা গেইল। ৯০ রান দরকার ছিল টি-টোয়েন্টিতে রেকর্ড ১১ হাজার রান পূরণ করতে। সেটা সেঞ্চুরি করে ছুঁয়েছেন। বিপিএলের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ছুঁয়েছেন ১০০টি ছক্কা মারার মাইলফলক। এরপর ভেঙেছেন নিজেরই গড়া সর্বোচ্চ ১৭টি ছক্কার হাঁকানোর রেকর্ড।
বিপিএলের দ্বিতীয় বিদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে পূরণ করে নিয়েছেন ১ হাজার রানও। সর্বশেষ এই ইনিংসটি দিয়ে চলতি বিপিএলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও হয়েছে গেছেন ক্যারিবিয়ান এই ব্যাটিং কিংবদন্তি। দুই সেঞ্চুরি ও দুই হাফ সেঞ্চুরিতে করেছেন ৪৮৫ রান। যা বিপিএলের এক আসরে কোনও ব্যাটসম্যানের জন্য সর্বোচ্চ সংগ্রহ। রংপুরকে শিরোপা জেতানো, সাথে গোটা কয়েক রেকর্ড। ফাইনালটি যেন কেবল গেইলের জন্যই বরাদ্দ ছিল।
চ্যাম্পিয়ন রংপুর রাইডার্স দিয়ে গুঁড়িয়ে ঢাকাকে 2017-12-13