এমএনএ আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়ার যেন হিড়িক পড়েছে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতার তৃণমূল ছেড়ে নেতারা ভিড়ছেন কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপিতে। মেদিনীপুরে শনিবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীসহ ৭ বিধায়ক। এদিন বিজেপিতে যোগদান করা ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যান্য দলের কিছু নেতা থাকলেও এর সিংহভাগই তৃণমূল কংগ্রেসের।
শনিবার অমিত শাহ দাবি করেন, তৃণমূল ত্যাগের এই জোয়ার এখন চলতেই থাকবে। নির্বাচনের সময় তৃণমূলে একাই থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দলটির একমাত্র নেতা ও একমাত্র কর্মী হিসেবে থেকে যাবেন। আর আগামী নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪ আসনের মধ্যে ২০০টিই জিতে নেবে বিজেপি। পরদিন রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে অমিতকে কটাক্ষ করে তৃণমূল নেতারা বলেন, একজন শুভেন্দুকে ভাগিয়েই এতো আসন দাবি করছে বিজেপি।
তৃণমূল নেতা ও পঞ্চায়েতমন্ত্রী সুব্রত মুখার্জি বলেন, ‘শুভেন্দুর দলবদলের কিছু কিছু সংবাদ আমাদের কাছে আগেও ছিল। তাই আমরা তাতে হতবাক হয়ে যাইনি। কেউ কেউ গেল গেল রব তুলেছেন। আমরা সেটা মনে করি না। আমাদের একজন নেত্রী আছেন, যার নাম মমতা ব্যানার্জি। মমতার জনপ্রিয়তাই আমাদের শক্তি। আর আমাদের দল না হয় সরকারে আছে। কিন্তু দীর্ঘদিন সরকারে নেই কংগ্রেস ও সিপিএম। তাদের দল থেকেও কয়েকজন চলে গিয়েছেন। এটা একটা রাজনৈতিক অসুখ। একটা শুভেন্দুকে নিলে কোনও ক্ষতি হবে না।
সুব্রত মুখার্জি বলেন, ‘আমরা এটাকে রাজনৈতিক চলে যাওয়া নয়, বলি বিশ্বাসঘাতকতা। এই বিশ্বাসঘাতকদের দলকে বাংলার মানুষ চিনে নেবে।’
দৃশ্যত দীর্ঘদিনের নেতাদের এভাবে দল ছেড়ে যাওয়ার নেপথ্যে একটা বড় কারণ তৃণমূলের অন্তর্কলহ। পদত্যাগী নেতাদের বক্তব্যে সেটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মেদিনীপুরে অমিত শাহের সভায় গিয়ে বিজেপিতে যোগ দেন বর্ধমান পূর্বের তৃণমূল সাংসদ সুনীল মণ্ডল। কালনার তৃণমূল বিধায়ক বিশ্বজিৎ কুণ্ডুকে সম্প্রতি দলের শহর সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে এলাকায় তাঁর বিরোধী গোষ্ঠীর নেতা হিসেবে পরিচিত দেবপ্রসাদ বাগকে ওই পদে বসানো হয়। তার পর থেকে বিশ্বজিৎবাবুকে দলের কর্মসূচিতে দেখা যাচ্ছিল না।
বৃহস্পতিবার কলকাতায় তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। এ দিন বিশ্বজিৎবাবুর দাবি, ওই বৈঠকে দলের স্থানীয় নেতৃত্বে কিছু রদবদলের দাবি জানিয়েছিলেন। তা বিবেচনার আশ্বাসে দলত্যাগের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখেন। কিন্তু শুক্রবার রাতে জানতে পারেন, সে বিবেচনা ফলপ্রসূ হওয়ার আগেই তিনি দলে থাকছেন বলে এক তৃণমূল সাংসদ দাবি করেছেন। তাতেই বিরক্ত হয়ে তিনি শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
একই জেলার মন্তেশ্বরের বিধায়ক সৈকত পাঁজা আগে দলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানাননি। বিজেপিতে গিয়ে আঙুল তুলেছেন তৃণমূলের গোষ্ঠী রাজনীতির সমস্যার দিকে।
শুভেন্দু ছাড়া পূর্ব মেদিনীপুরের তিন বিধায়ক এদিন বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। তারা হলেন উত্তর কাঁথির তৃণমূল বিধায়ক বনশ্রী মাইতি, হলদিয়ার সিপিএম বিধায়ক তাপসী মণ্ডল ও তমলুকের সিপিআই বিধায়ক অশোক দিন্দা।
বনশ্রীর বক্তব্য, শুভেন্দুকে দেখেই রাজনীতিতে এসেছি। তার পথেই চলব।
বাম-বিধায়ক তাপসীর দাবি, দলে থেকে কাজ করতে পারছিলাম না। আর সবংয়ের নেতা অমূল্য মাইতির দাবি, তার দলত্যাগের প্রধান কারণ, মানস ভুঁইয়ার সঙ্গে বিরোধ।
২০১৬-র বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে সিপিএমের টিকিটে জেতেন গাজলের বিধায়ক দীপালি বিশ্বাস। সে বছরই শুভেন্দুর হাত ধরে তৃণমূলে যোগ দেন তিনি ও তাঁর স্বামী রঞ্জিত। এ দিন এ দম্পতি বিজেপিতে গেলেন।
গত লোকসভা ভোটে ডুয়ার্সের আদিবাসী প্রধান এলাকা এবং চা-বলয়ে বিজেপির প্রভাব বাড়তে দেখে নাগরাকাটার তৃণমূল বিধায়ক শুক্রা মুন্ডা এবং আলিপুরদুয়ারের প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ দশরথ তিরকে দল বদলেছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। তবে এই দুই নেতা দলে আসছেন জেনে এ দিন ডুয়ার্সের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ দেখান বিজেপি কর্মীরা।
লোকসভা ভোটের ফলের নিরিখে পুরুলিয়া পৌরসভাসহ জেলার অধিকাংশ এলাকায় এগিয়ে বিজেপি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ফের বিধায়ক হওয়ার আশা থেকেই দল বদলালেন সুদীপ মুখোপাধ্যায়, তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেসে গিয়ে বিধায়ক হওয়া নেতা। শুভেন্দু-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত সুদীপ বলেছেন, মানুষ এখন বিজেপিকে চাইছে।
তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে দলে থাকা পুরশুড়ার প্রাক্তন বিধায়ক পারভেজ রহমান গত বিধানসভা ভোটে টিকিট না-পাওয়ায় ক্ষুব্ধ ছিলেন। বিজেপিতে গিয়ে তার দাবি, শুভেন্দুর সঙ্গে মেলামেশা করি বলে তৃণমূল ডাকে না। মানুষের জন্য কাজ করতে মঞ্চ দরকার। তাই বিজেপিতে যোগ দিলাম।
রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী তথা বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের প্রাক্তন পুরপ্রধান শ্যাম মুখোপাধ্যায় সম্প্রতি পুর প্রশাসকের পদ হারান। শ্যামবাবুর দাবি, মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ না পেয়েই তৃণমূল ছেড়েছেন।
পূর্ব মেদিনীপুরের জেলা তৃণমূল থেকে সদ্য বহিষ্কৃত কণিষ্ক পন্ডা, ধীরেন্দ্রনাথ পাত্র এদিন বিজেপিতে গিয়েছেন। পশ্চিম থেকে দল বদলেছেন জেলা পরিষদ সদস্য অমূল্য মাইতি, রমাপ্রসাদ গিরি, তপন দত্ত, কাবেরী চট্টোপাধ্যায়, মেদিনীপুরের প্রাক্তন পুরপ্রধান প্রণব বসু, তৃণমূলের কিষান সেলের নেতা দুলাল মণ্ডলের মতো শুভেন্দু-ঘনিষ্ঠেরা।
পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা তৃণমূল সভাপতি অজিত মাইতি বলেন, ‘কারও মনে হয়েছে এখানে যা নেওয়ার তা পূরণ হয়েছে, এবার ওখানে যাব। এতে দলের ক্ষতি হবে না।’
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

