Don't Miss
Home / হোম স্লাইডার / বিশ্ব এখন বাংলাদেশকে কী চোখে দেখে
দেশকে গত ৫০ বছর ধ

বিশ্ব এখন বাংলাদেশকে কী চোখে দেখে

এমএনএ ফিচার ডেস্ক : একাত্তরে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে বিশ্বকে আগমনী বার্তা জানিয়েছে বাংলাদেশ। তলাবিহীন, যুদ্ধবিধ্বস্তে দেশকে গত ৫০ বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ সোনার বাংলা গড়তে অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। আগামী ২০৪১ সালে উন্নত বিশ্বে যোগ দেওয়ার আগে সংকল্প যাত্রায় এরই মধ্যে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উত্তীর্ণ হওয়ার পরীক্ষায় পাস করেছে। প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় অর্থনৈতিক-সামাজিক খাতের একাধিক সূচকে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ, যদিও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা এবং দুর্নীতির সূচকে পিছিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশিরা এখনও বাংলাদেশকে ভারতের চোখে দেখে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘অনেকেই আমাদের আলাদাভাবে দেখে।’

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে এখনও নিজেদের বড় ধরনের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়তে পারেনি। বিভিন্ন সময়েই বাংলাদেশিরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে মীমাংসার জন্য বিদেশিদের ওপর নির্ভর করে, যা দেশের ভাবমূর্তির জন্য কখনও ইতিবাচক নয়। বাংলাদেশ প্যারাডক্সের উদাহরণ দিয়ে বিদেশিরা বলে যে দুর্নীতি, অনেক সমস্যা, অল্প জায়গায় অনেক মানুষের বসবাস; কিন্তু এর মধ্য দিয়েও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এটা এক ধরনের প্রশংসা; কিন্তু এর মধ্যে পরোক্ষভাবে খোঁচা আছে। কারণ এখানে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে যে বাংলাদেশের পরিবেশ-পরিস্থিতি এত খারাপ যে এর মধ্যে এত উন্নতি করার কথা নয়, কিন্তু হচ্ছে। আর ভাবমূর্তি একদিনে সৃষ্টি হয় না, আবার একদিনে ভেঙেও পড়ে না।

শুধু অর্থনৈতিক উন্নতি হলেই ভাবমূর্তির উন্নতি ঘটে না। অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক উন্নতি সবকিছু মিলেই ভাবমূর্তি। যেমন আমরা এখনও বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে শীর্ষ পর্যায়ে আছি, যা ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। প্রধানমন্ত্রী-বিরোধী দলীয় নেতা-জাতীয় সংসদের স্পিকারসহ সমাজের একাধিক ক্ষেত্রে আমাদের নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছে; কিন্তু তারপরও নারী নির্যাতন থামছে না, যা ভালো নয়। ব্যাংকের অর্থ লুট করে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার খবর বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়। অপরাধের দায়ে জনপ্রতিনিধি (সাবেক এমপি পাপুল) অন্য দেশের কারাগারে সাজা খাটলে দেশের ভাবমূর্তি কীভাবে থাকে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমীন গতকাল এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমেরিকা বা অন্যদের পররাষ্ট্র নীতিতে আমরা এখনও দেখি যে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ স্বতন্ত্র একটা পরিচয় গড়তে পারলেও তারা এটাতে এখনও তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাদের কাছে আঞ্চলিকভাবেও বাংলাদেশ গুরুত্ব পাচ্ছে না। অনেক সময় তারা মুখে বলে বাংলাদেশ এমাজিং পাওয়ার; কিন্তু তাদের পররাষ্ট্র নীতিতে এর প্রতিফলন এখনও দেখা যায়নি। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের উপ-সহকারী এক মন্ত্রী গত বছরের শেষভাগে বলেছেন যে, তারা বাংলাদেশকে স্বতন্ত্র দেশ হিসেবেই মূল্যায়ন করে; কিন্তু আমরা তাদের পররাষ্ট্র নীতিতে এখনও এর প্রতিফলন পাইনি। বাংলাদেশকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টা এখনও তাদের অফিসিয়াল বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ, তাদের কাজকর্মে এখনও তার প্রতিফলন পাওয়া যায়নি।’

কেন বাংলাদেশ গুরুত্ব পাচ্ছে না- এমন প্রশ্নের জবাবে ড. লাইলুফার ইয়াসমীন বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের স্কলারদের মধ্যে একটা প্রবণতা আছে নিজেদেরকে ছোট হিসেবে ভাবা এবং দেখা, যেখানে প্রয়োজন সেখানে আমরা নিজেদেরকে তুলে ধরতে পারছি না। আমাদের দেশের আকর্ষণীয় জায়গা বা ইস্যু বিশ্বে আমাদেরকেই তুলে ধরতে হবে, এখানে ঘাটতি রয়েছে।’

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন গতকাল এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘পশ্চিমারা বাংলাদেশকে ভারতের চোখে দেখত, এটা তাদের প্রবণতা ছিল, এখন এটা থেকে আমরা খানিকটা বের হয়ে আসতে পেরেছি। পেছনের কারণ হচ্ছে আমরা অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি করেছি, সামাজিক সূচকেও অনেকের চেয়ে ভালো করেছি।’ কেন তারা ভারতের চোখে দেখে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভারতীয়দের চোখে দেখলে তাদের কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়, তাদের নিজেদের আর কষ্ট করে স্ক্রুটিনি করতে হয় না। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদ মাধ্যমে বাংলাদেশ বা বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ যত সহজে প্রকাশিত হয়, ভারতীয়দের বিরুদ্ধে তা হয় না। মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রচুর ভারতীয় এবং পাকিস্তানি কাজ করে। তারা সবাই বাংলাদেশিদের বদনাম করার ক্ষেত্রে একাত্মা। এ ছাড়া রাজনৈতিকভাবে প্রতিটি ইস্যুতে আমরা সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করি, এটাও বড় একটা কারণ, এটা বড় দুর্বলতা।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব এবং রাষ্ট্রদূত মো. মাহফুজুর রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হয় যে, বিশ্ব কি এখনও বাংলাদেশকে ভারতের চোখে দেখে? জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা সত্য (আনফরচুনেটলি, ইটস ট্রু)।’ বাংলাদেশ কী এই জায়গার অগ্রগতি করতে পেরেছে, জবাবে সাবেক এই অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘না, আমরা পারিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমরা এখানে পরিবর্তন ঘটাতে পারিনি। এটা অনেকেই মানতে চাইবে না, কারণ আমাদের প্রত্যেকেরই যাত্রাভিমান আছে কিন্তু এটা সত্য।’

মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘অনেকগুলো কারণে বিশ্ব বাংলাদেশকে ভারতের চোখে দেখে, যার মধ্যে একটা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ (ডমেস্টিক) সমস্যা। এর বাইরে আমাদের বড় ধরনের ভাবমূর্তির সমস্যা আছে, আমরা ভারতকে বাদ দিয়ে সেপারেট একটা এনটিটি হিসেবে নিজেদেরকে এখনও প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ভাবমূর্তিকে আমরা এখনও প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ সমস্যার মূলে হচ্ছে রাজনৈতিক।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এই বিষয়ে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ভূ-রাজনীতির কারণে, আমাদের উন্নয়নের কারণে, শেখ হাসিনার কারণে বিশ্বে আমরা এখন একটা প্রিন্সিপাল পজিশন মেনটেইন করি। সেজন্য অনেকেই আমাদের আলাদাভাবে দেখে। আমরা কোনো নির্দিষ্ট কোনো বলয় রক্ষা করে চলি না, আমাদের পররাষ্ট্রের নীতি অনুযায়ী, আমরা সবার সঙ্গেই চলি। তবে আমাদের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের বেশি সম্পর্ক, বিভিন্ন বিষয় যেমন প্রিন্সিপালস-ভেলুজ তাদের সঙ্গে বেশি যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্রের জন্য বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি। অথচ অন্যরা আমার কাছে এসে গণতন্ত্র শেখাতে চায়, এই দেশ গঠিত হয়েছে তখন, যখন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সরকার গঠনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এই দেশটা সৃষ্টিই হয়েছে গণতন্ত্রের জন্য। তারও আগে ষষ্ঠ শতাব্দীতে আমাদের এখানে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি। ওই সময়ে, শশাঙ্কের সময় জালালউদ্দিন (যদু নাম পরিবর্তন করে জালালউদ্দিন হয়) সরকারে আসে ভোট করে। আর এখন অন্যরা আসে আমাদের গণতন্ত্র শেখাতে, তারা গণতন্ত্র নিয়ে বই লিখেছে বেশি আর আমার এখানে লেখালিখি কম হয় সেজন্য আমাদের কথা অনেকেই জানে না। তাদের ভাষায়ও আমাদের লোকজন লিখেনি, তা না হলে তো ষষ্ঠ শতাব্দীতে আমরাই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি, এখানেই যার উদাহরণ রয়েছে। বাংলাদেশ সবসময়েই গণতন্ত্রের অগ্রদূত।

x

Check Also

জীবন বিমা খাতে বকেয়া দাবির পাহাড়, আস্থার সংকটে পুরো সেক্টর

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক বিমাকে বলা হয় বিপদের বন্ধু—দুর্যোগ, অনিশ্চয়তা কিংবা জীবনের কঠিন সময়ে আর্থিক সুরক্ষার এক ...