অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে দেশে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের আরোপিত সময়সীমা এবারের পহেলা বৈশাখের বেচাকেনায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে বাড়িয়ে ৭টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখার সুযোগ দেওয়া হলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে কাঙ্ক্ষিত বিক্রি হয়নি; বরং বাজারে নেমেছে “ধস”।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বৈশাখকে কেন্দ্র করে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে বিক্রি হয়েছে মাত্র ৭ হাজার কোটি টাকার পণ্য। অর্থাৎ, প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার পণ্য অবিক্রীত থেকে গেছে।
দোকান মালিক সমিতির দাবি, মোট উৎপাদিত ও বাজারজাত পণ্যের ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিক্রি হয়নি। তাদের মতে, সন্ধ্যার আগেই দোকান বন্ধের কারণে বিক্রি অন্তত ৫০ শতাংশ কমে গেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের খুচরা বাজারে সন্ধ্যার পরই ক্রেতাদের চাপ বাড়ে এবং বিক্রির মূল সময় শুরু হয়। কিন্তু সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই গুরুত্বপূর্ণ সময় পুরোপুরি হারাতে হয়েছে।
ফ্যাশন উদ্যোক্তারা জানান, অনেক ক্রেতাই কর্মব্যস্ততার কারণে সন্ধ্যার আগে বাজারে যেতে পারেন না। ফলে সময়সীমার কারণে তাদের বড় একটি অংশ বাজার থেকে ছিটকে পড়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যবসায়ীরা কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দোকান খোলা রাখার সময় বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছেন।
তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী— ঈদের আগের এক মাসের প্রথম ১৫ দিন রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখা ও পরবর্তী ১৫ দিন গভীর রাত (১২টা থেকে ১টা) পর্যন্ত ব্যবসার সুযোগ দেওয়া।
এছাড়া অনেক ব্যবসায়ী ভারতের মতো দুপুরে দোকান খুলে রাত পর্যন্ত খোলা রাখার মডেল চালুর প্রস্তাবও দিয়েছেন।
বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফুর রহমান টিপু বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই তারা রাত ৯টা বা ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে জ্বালানি পরিস্থিতির কারণে সরকার এখনো বিষয়টি বিবেচনায় নেয়নি।
তিনি জানান, “সন্ধ্যায় দোকান বন্ধের সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাবে বৈশাখে বেচাকেনা অন্তত ৫০ শতাংশ কমেছে। ২০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য থাকলেও বিক্রি হয়েছে মাত্র ৭ হাজার কোটি টাকা।”
তিনি আরও বলেন, “কোরবানির ঈদের আগে অন্তত এক মাস সময়সীমা শিথিল করতে হবে। প্রথম ১৫ দিন রাত ১০টা এবং পরের ১৫ দিন রাত ১২টা-১টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার সুযোগ দিলে আমরা কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবো।”
ফ্যাশন হাউজ ‘সাদাকালো’র অন্যতম উদ্যোক্তা ও এফইএবি সভাপতি আজহারুল হক আজাদ বলেন, সন্ধ্যায় দোকান বন্ধের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য তারা শুরু থেকেই দাবি জানিয়ে আসছেন, কিন্তু এখনো কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
তার মতে, “এই সিদ্ধান্তের কারণে বৈশাখের বেচাকেনায় ধস নেমেছে। বিপুল পরিমাণ পণ্য অবিক্রীত রয়ে গেছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ।”
অন্যদিকে, পোশাক ব্র্যান্ড ‘বিশ্বরঙ’-এর কর্ণধার বিপ্লব সাহা বলেন, “বর্তমান সময়সীমার কারণে ব্যবসা পরিচালনাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যক্তিগত কাজ শেষে শোরুমে যাওয়ার আগেই মার্কেট বন্ধ হয়ে যায়। টিকে থাকার জন্য সময় বাড়ানো জরুরি।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব, জ্বালানি সংকট এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত প্রভাবে দেশের খুচরা বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সময়সীমা শিথিল না করা হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, সময় বাড়ানো গেলে বাজারে ক্রেতা উপস্থিতি বাড়বে এবং অন্তত আংশিকভাবে হলেও বর্তমান ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

